কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই কিউবা জানিয়েছে, বুধবার ফ্লোরিডা থেকে আসা একটি স্পিডবোটে করে তাদের ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশের’ চেষ্টাকালে চারজন ভারী অস্ত্রধারীকে গুলি করে হত্যা করেছে তাদের বাহিনী। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডা থেকে ১০০ মাইলেরও বেশি দূরে ভিলা ক্লারা প্রদেশের ফ্যালকনেস কি (Falcones Cay)-এর জলসীমায় বোটটি প্রবেশ করলে কিউবান বর্ডার গার্ডরা সেটির দিকে এগিয়ে যায়।
বিবৃতি অনুযায়ী, স্পিডবোটের এক যাত্রী কিউবান টহল জাহাজের দিকে গুলি ছোড়ে, এতে তাদের কমান্ডার আহত হন। এর জবাবে কিউবান বাহিনী পাল্টা গুলি চালায়। স্পিডবোটে থাকা আরও ছয়জন আহত হন এবং বর্তমানে তারা নিরাপত্তা হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছেন।
মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী বিবৃতিতে জানানো হয়, যাত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কিউবান এবং তাদের কাছে অ্যাসল্ট রাইফেল, হ্যান্ডগান ও মলোটভ ককটেল ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অনুপ্রবেশ করা’। জীবিতদের মধ্যে দুজনকে আগে থেকেই সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে খুঁজছিল কিউবা। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ওই জলযানে কোনো মার্কিন সরকারি কর্মী ছিলেন না এবং এটি কোনো সরকারি অভিযানও ছিল না।
মেরিটাইম ডাটাবেস অনুযায়ী, কিউবান কর্তৃপক্ষের দেওয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর (FL7726SH) একটি ২৪ ফুট দৈর্ঘ্যের পাওয়ার বোটের সাথে মিলে যায়, যা ১৯৮১ সালে তৈরি হয়েছিল। কিউবান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের গ্রহণে সহায়তা করতে’ পাঠানো আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। সিএনএন এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটল। জানুয়ারিতে কিউবার মিত্র ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন কিউবার দিকে নজর দিয়েছে। দ্বীপে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সরকার পরিবর্তনের কথাও বলা হচ্ছে। এই অবরোধের ফলে কিউবার অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। জাতিসংঘ সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
তবে বুধবার যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনে কিউবায় বিক্রি করতে ইচ্ছুক বেসরকারি কিউবান প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া হবে। ভেনেজুয়েলাই কিউবার জ্বালানির প্রধান উৎস, আর এই বাজার মূলত সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে।
কিউবা ও মার্কিন বোটের মধ্যে আগেও সংঘর্ষ হয়েছে
অতীতেও মার্কিন বোট কিউবার জলসীমায় প্রবেশ করলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তবে এমন প্রাণঘাতী গোলাগুলি বিরল। হাভানার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২২ সালে তারা ১৩টি মার্কিন স্পিডবোট আটকেছিল এবং ২৩ জন ক্রুকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
বুধবার যেখানে স্পিডবোটটি আটকানো হয়, সেই ভিলা ক্লারা প্রদেশের উত্তর উপকূল সাদা বালুর সৈকত ও অগভীর পানির জন্য পরিচিত। এর আগে ইউএস কোস্ট গার্ড তাদের উপকূলের কাছে স্পিডবোট আটকেছিল, যেগুলো অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে কিউবানদের একটি বড় নির্বাসিত গোষ্ঠী বাস করে, যারা মূলত কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধী।
এই ঘটনাটি ঘটল ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামের কিউবান-আমেরিকান মানবিক সংস্থার দুটি বিমান কিউবান সামরিক বাহিনী কর্তৃক ভূপাতিত করার ৩০ বছর পূর্তির মাত্র একদিন পর। হাভানার উত্তরে সেই ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছিলেন। এই মাসের শুরুতে, ট্রাম্প ক্লিনটন আমলের একটি জরুরি ব্যবস্থা নবায়ন করেছেন, যা বিমান ভূপাতিত করার ওই ঘটনার পর জারি করা হয়েছিল। এই আইনের বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ কিউবার দিকে যেতে পারে এমন যেকোনো জলযানে তল্লাশি চালাতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ১০ লাখ কিউবান যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ছোট নৌকায় করে ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছে। তবে আগের ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান প্রশাসনের মতো ট্রাম্প কিউবানদের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে গণ্য না করে রেকর্ড সংখ্যক কিউবানকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তদন্তের দাবি
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, কিউবান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর হাভানার মার্কিন দূতাবাস বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং ইউএস কোস্ট গার্ডও এর সাথে যুক্ত রয়েছে। সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে সরকারি সফরে থাকা রুবিও বলেন, “আমরা খুঁজে বের করব আসলে কী ঘটেছে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।” তিনি আরও বলেন, “খোলা সমুদ্রে এমন গোলাগুলির ঘটনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কিউবার জলসীমায় বহুদিন এমন কিছু ঘটেনি।”
ফ্লোরিডার কর্মকর্তারা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং কিউবান সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস ইউথমিয়ার জানান, তিনি ফেডারেল ও রাজ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তদন্ত শুরু করতে সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান কার্লোস এ. গিমেনেজ, যার নির্বাচনী এলাকা ফ্লোরিডার দক্ষিণাঞ্চল, বলেন—মার্কিন নিবন্ধিত জলযানে থাকা মানুষের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ উদ্বেগের বিষয়। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “মার্কিন কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে নিহতদের মধ্যে কেউ মার্কিন নাগরিক বা বৈধ বাসিন্দা ছিলেন কি না। মানবতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অপরাধের জন্য কিউবার সরকারকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা উচিত।” ফ্লোরিডার রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কট ঘটনাটিকে “গভীর উদ্বেগজনক” বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন কিউবান সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
সূত্র : সিএনএন
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!