ভারত, মোদি, কার্নি, কানাডা
নরেন্দ্র মোদি ও মার্ক কার্নি   ছবি: সংগৃহীত

অটোয়ায় যখন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই রোববার ভ্যাঙ্কুবারের সারে-তে এক শিখ অ্যাক্টিভিস্টের দরজায় কড়া নাড়ে কানাডিয়ান পুলিশ। উদ্দেশ্য ছিল তাকে সতর্ক করা যে, তার জীবন ঝুঁকির মুখে। কানাডার শিখ ফেডারেশনের প্রধান মনিন্দার সিং এর আগেও ভ্যাঙ্কুবার পুলিশের কাছ থেকে এমন তিনটি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। তবে এবার গোপন সোর্সের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, শুধু তিনি নন, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের জীবনও বিপন্ন।

বাড়ির ডোরবেল ক্যামেরায় রেকর্ড করা কথোপকথনে পুলিশ অফিসারকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে বিশেষভাবে বলা হয়েছে আপনাকে জানাতে যে, এই হুমকি আপনি, আপনার স্ত্রী এবং আপনার দুই সন্তানের ওপরও রয়েছে।” মনিন্দার সিং ছিলেন শিখ অ্যাক্টিভিস্ট ও কানাডীয় নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জারের সহযোগী, যাকে ২০২৩ সালের জুনে কানাডায় হত্যা করা হয়েছিল। ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক কূটনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। কানাডা অভিযোগ করেছিল যে নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের এজেন্টরা জড়িত এবং একে বিদেশে শিখ অ্যাক্টিভিস্টদের দমনে ভারতের আন্তঃসীমান্ত দমননীতির অংশ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

কিন্তু রবিবার যখন সিংকে তার ও তার পরিবারের ওপর হুমকির কথা জানানো হচ্ছিল, তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেল বুধবার। কার্নির দিল্লি পৌঁছানোর মাত্র দুদিন আগে এক জ্যেষ্ঠ কানাডিয়ান সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিকদের এক গোপন ব্রিফিংয়ে বলেন, নিরাপত্তার জন্য ভারত “এখন আর কোনো হুমকি নয়”।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের প্রতি কানাডার দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। প্রধানমন্ত্রী কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব সামলাতে বৈদেশিক সম্পর্ক বহুমুখী করার চেষ্টা করছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কার্নির এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরায় গড়ে তোলার (reset) সূচনা হতে পারে, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সময়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।

সম্পর্কে ফাটল

গত বছরের মার্চে ট্রুডোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কার্নি সরকার গঠনের পর থেকেই অটোয়ার পরিবেশ অনেকটা বদলে গেছে। ট্রুডোর আমলে কানাডা ও ভারতের সম্পর্ক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনায় অত্যন্ত খারাপ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, বিশেষ করে ২০২৩ সালে নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের পর।

নিজ্জার ছিলেন ভারতের অভ্যন্তরে ‘খালিস্তান’ নামে একটি স্বাধীন শিখ রাষ্ট্রের বিশিষ্ট প্রবক্তা। নয়াদিল্লি একে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে মনে করে এবং নিজ্জারসহ এই আন্দোলনের সাথে যুক্তদের “সন্ত্রাসী” হিসেবে গণ্য করে। নিজ্জার হত্যার পর কানাডার প্রভাবশালী শিখ প্রবাসীদের চাপে ট্রুডো জবাবদিহিতার দাবি তোলেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বিদেশি হস্তক্ষেপ বিষয়ক এক তদন্তে ট্রুডো বলেছিলেন, কানাডার মাটিতে শিখ অ্যাক্টিভিস্টদের লক্ষ্যবস্তু করে ভারত যে কানাডার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে, তার “ক্রমশ স্পষ্ট ইঙ্গিত” পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের কর্মকাণ্ডকে ট্রুডো “ভয়াবহ ভুল” বলে অভিহিত করেছিলেন।

কানাডা আরও অভিযোগ করেছিল যে ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে এবং পছন্দের রাজনীতিবিদদের অর্থায়ন করছে। ভারত দৃঢ়ভাবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে “অযৌক্তিক” বলে আখ্যায়িত করে এবং কানাডার মাটি থেকে পরিচালিত ভারত-বিরোধী উপাদানগুলোর (পরোক্ষভাবে শিখ অ্যাক্টিভিস্টদের বুঝিয়ে) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়।

তবে নিজ্জার হত্যাকাণ্ড ভারতের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মার্কিন বিচার বিভাগ গুরপতবন্ত সিং পন্নুন নামে এক আমেরিকান আইনজীবী ও শিখ অ্যাক্টিভিস্টকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এক ভারতীয় নাগরিককে অভিযুক্ত করে।

৫৪ বছর বয়সী নিখিল গুপ্তা, যার বিরুদ্ধে পন্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল, তিনি এই মাসের শুরুতে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে তিনটি অপরাধমূলক অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন। ভাড়ায় হত্যা (murder-for-hire), হত্যার ষড়যন্ত্র ও অর্থপাচারের ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করায় তার ৪০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। যুক্তরাজ্যের শিখ অ্যাক্টিভিস্টদেরও ভারত সরকারের হুমকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক হর্ষ পন্ত বলেন, এই ইস্যুতে ট্রুডোর দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমস্যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার সংঘাতমূলক আচরণের কারণে যেসব সমস্যা আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ে সমাধান করা যেত, সেগুলোকে কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং দুটির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

বরফগলা সম্পর্ক

২০২৫ সালে লিবারেল পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হয়ে জাস্টিন ট্রুডোর স্থলাভিষিক্ত হন মার্ক কার্নি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক উত্তেজনা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে তিনি দায়িত্ব নেন। এই হুমকি মোকাবেলায় কার্নি সক্রিয়ভাবে নতুন অংশীদার খুঁজতে থাকেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানাতে দেরি করেননি এবং অংশীদারিত্ব জোরদার করার আহ্বান জানান। শীঘ্রই কার্নি মোদিকে গত জুনে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান এবং সেখানে দুই নেতা পার্শ্ববৈঠক করেন। এরপর দুই দেশেই নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া হয়।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল কুজেলম্যান আল জাজিরাকে বলেন, হঠাৎ করেই সম্পর্কের সবকিছু বদলে গেছে। তিনি বলেন, “সম্পর্ক নিয়ে এখন অনেক বেশি আশাবাদ ও গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে।” কার্নির অধীনে কানাডা সরকার বুঝতে পেরেছে যে এই সম্পর্ক নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পেছনে কানাডার বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। আর এর শুরুটা হতে হবে সুর ও মেজাজ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কানাডিয়ান কর্মকর্তাদের “ভারত এখন আর হুমকি নয়” মন্তব্যটি সেই পরিবর্তনেরই অংশ।

এশিয় প্যাসিফিক ফাউন্ডেশন অফ কানাডার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিনা নাজিবুল্লাহ বলেন, অটোয়া এখন সংকট-চালিত অবস্থান থেকে সরে এসে ধাপে ধাপে সম্পর্ক পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন, কার্নির অধীনে মেগাফোন কূটনীতির বদলে কাঠামোগত চ্যানেলের মাধ্যমে নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অটোয়া একই সাথে দুটি কাজ করতে চাইছে: দেশের ভেতরে আইনের শাসন রক্ষা করা এবং বিদেশে পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রগুলো এগিয়ে নেওয়া।

তবে কার্নির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে শিখ অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর হুমকির সমস্যা উধাও হয়ে গেছে। কুজেলম্যান বলেন, “কানাডিয়ান কর্মকর্তারা অবশ্যই এখনও আন্তঃসীমান্ত দমনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত, বিশেষ করে যখন আইনি প্রক্রিয়া চলছে।” বর্তমান সরকার কেবল সমস্যাটি সমাধানের জন্য ভারতের সাথে কাজ করার ওপর ভিত্তি করে একটি ‘সমঝতামূলক’ পন্থা অবলম্বন করছে।

কানাডিয়ান কর্মকর্তারা গোপনে ব্রিফিং দিলেও, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারত ‘হুমকি কি না’—তা সরাসরি এড়িয়ে যান। তিনি শুধু বলেন, আন্তঃসীমান্ত সহিংসতার বিষয়ে দুই সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। নয়াদিল্লিও ‘খালিস্তানি চরমপন্থা’র চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে চাইবে, যা কার্নির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন হর্ষ পন্ত।

সামনের পথ

শুক্রবার কার্নি তার দুদিনের দিল্লি সফর শুরু করেছেন। দুই প্রধানমন্ত্রী হায়দ্রাবাদ হাউসে বৈঠক করবেন এবং ভারত-কানাডা কৌশলগত অংশীদারিত্ব পর্যালোচনা করবেন। কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, কৃষি, শিক্ষা এবং গবেষণার মতো খাতে চুক্তির প্রত্যাশা করছেন। হর্ষ পন্তের মতে, এই খাতগুলোতে সহযোগিতাই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।

কুজেলম্যানের মতে, কার্নির দিল্লি সফরের মূল বাহ্যিক কারণ হলো ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র—যা উভয়েরই শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার—তার সঙ্গে কানাডা ও ভারত উভয়েরই সম্পর্কে অবনতি হয়েছে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারলেও, অটোয়া এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে। কুজেলম্যান বলেন, “যেসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাজ করেছে, তারা এখন অন্য অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে। অটোয়া এবং নয়াদিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সম্পর্কটি ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা এবং আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।”

ভিনা নাজিবুল্লাহ যোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বহুমুখী করার ক্ষেত্রে কানাডার জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি সতর্ক করেন যে, আন্তঃসীমান্ত সহিংসতার মতো অমীমাংসিত সমস্যাগুলো এই বিকাশমান সম্পর্কের স্থায়িত্বকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া ও সহযোগিতা ছাড়া নিরাপত্তা অভিযোগগুলো অমীমাংসিত থাকলে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়বে এবং পরবর্তী যেকোনো ঘটনা বা আদালতের রায়ে তা আবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই