ইরান, ট্রাম্প, খামেনি, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, চীন
চীনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম বেইদু   ছবি: সংগৃহীত

গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরান হয়তো চীনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন (দিকনির্দেশনা) সিস্টেম ব্যবহার করছে। ফরাসি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক পরিচালক অ্যালাইন জুয়েল গত সপ্তাহে ফ্রান্সের স্বাধীন পডকাস্ট 'তোকসিন'-কে জানান, এমনটা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে ইরানকে চীনের 'বেইদু' স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কারণ, গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাত্রা অনেক বেশি নিখুঁত হয়ে উঠেছে।

২০০২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক হিসেবে কাজ করা জুয়েল পডকাস্টটিতে বলেন, "এই যুদ্ধে অন্যতম বিস্ময়কর বিষয় হলো, আট মাস আগের তুলনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন অনেক বেশি নির্ভুল, যা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর দিকনির্দেশনা (গাইডেন্স) ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।"

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা এবং সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ শীর্ষ ইরানি নেতাদের হত্যার জবাবে ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

যদিও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো এর বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিয়েছে, তারপরও বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের সরকারি মালিকানাধীন গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস-এ (GPS) ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বা এর প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিতে পারে (যা আগে ইরানের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করত)। কিন্তু ইরান যদি চীনের বেইদু সিস্টেম ব্যবহার করে থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে বাধা দিতে খুব একটা কিছু করতে পারবে না। অবশ্য ইরান এ বিষয়ে কোনো সত্যতা নিশ্চিত করেনি বা মন্তব্যও করেনি।

নিচে বেইদু সিস্টেম সম্পর্কে যা জানা গেছে এবং ইরান এটি ব্যবহার করলে তা যুদ্ধক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটাতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করা হলো:

বেইদু নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম কী?

চীন তাদের স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণটি চালু করে ২০২০ সালে, যা জিপিএস-এর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২০ সালের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিস্টেমটি উদ্বোধন করেন।

১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর চীন নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম তৈরির কাজ শুরু করেছিল, কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল যে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন তাদের জিপিএস ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করে দিতে পারে। বেইদুর সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই সিস্টেমের লক্ষ্য হলো "বিশ্বের সেবা করা এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন।"

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের এই সিস্টেমটি অন্যান্য নেভিগেশন সিস্টেমের তুলনায় অনেক বেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। আল জাজিরার এজে ল্যাবস (AJ Labs) ডেটা টিমের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন জিপিএস সিস্টেমে তথ্য সরবরাহের জন্য ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, যেখানে চীনের সিস্টেমে রয়েছে ৪৫টি। বিশ্বের অন্য দুটি প্রধান নেভিগেশন সিস্টেম হলো রাশিয়ার গ্লোনাস (GLONASS) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও (Galileo), যার প্রতিটিতে ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে।

বেইদুর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সিস্টেমটি তিনটি অংশে বিভক্ত—মহাকাশ অংশ, ভূমি অংশ এবং "ব্যবহারকারী" অংশ। ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, "বিডিএস-এর ভূমি অংশটি মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন, টাইম সিনক্রোনাইজেশন/আপলিঙ্ক স্টেশন, মনিটরিং স্টেশন এবং আন্তঃস্যাটেলাইট সংযোগের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা সুবিধা নিয়ে গঠিত।"

"অন্যদিকে বিডিএস-এর ব্যবহারকারী অংশটি বিভিন্ন ধরনের বিডিএস পণ্য, সিস্টেম ও পরিষেবা দিয়ে গঠিত, যা চিপস, মডিউল, অ্যান্টেনা, টার্মিনাল এবং অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেমের মতো অন্যান্য নেভিগেশন সিস্টেমের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।" বিশ্বব্যাপী কভারেজ প্রদানকারী বেইদু অন্যান্য স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেমের মতোই স্যাটেলাইট থেকে মাটিতে বা যানবাহনে থাকা রিসিভারে টাইমিং সিগন্যাল (সময়ের সংকেত) পাঠানোর মাধ্যমে কাজ করে। একাধিক স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যালগুলো রিসিভারে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে, তা পরিমাপ করে এই সিস্টেম কোনো কিছুর সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে।

ব্রাসেলস-ভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, "পরিষেবার স্তরের ওপর ভিত্তি করে এর নির্ভুলতার মাত্রা ভিন্ন হয়। উন্মুক্ত বা সাধারণ সিগন্যালগুলো সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় করতে পারে, কিন্তু অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের জন্য সংরক্ষিত (রেস্ট্রিক্টেড) পরিষেবাগুলো আরও অনেক বেশি নির্ভুলতা প্রদান করতে পারে।"

ইরান কি বেইদু ব্যবহার করছে?

ইরান এর সত্যতা নিশ্চিত করেনি। গত বছর ইসরায়েলের সাথে জুনের যুদ্ধের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে সামরিক অভিযানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেমে স্থানান্তর করা আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। সেই সংঘাতের পর, ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে ইরান "বিশ্বের বিদ্যমান সব ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করে এবং কোনো একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না।"

তবে ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তা জুয়েল তোকসিন পডকাস্টে বলেন, গত বছরের তুলনায় ইরান কীভাবে তাদের হামলার নির্ভুলতা এতটা বাড়িয়েছে, তার একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হতে পারে চীনের বেইদু সিস্টেমে যুক্ত হওয়া। "জিপিএস সিস্টেমের বদলে চীনের সিস্টেম ব্যবহার করার কথা শোনা যাচ্ছে, যা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের এমন নিখুঁত নিশানার বিষয়টিকে স্পষ্ট করে। ... বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।"

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান কেবল গত আট মাস ধরেই নয়, বরং আরও অনেক আগে থেকেই চীনের নেভিগেশন সিস্টেম যুক্ত করার কাজ করে আসছে। চীন-ইরান সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ এবং গবেষণামূলক প্ল্যাটফর্ম 'চায়নামেড প্রজেক্ট'-এর গবেষক থিও নেনসিনি আল জাজিরাকে বলেন, "খবর রয়েছে যে, ২০১৫ সালেই ইরান তাদের সামরিক অবকাঠামোতে বেইদু-২ যুক্ত করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। বিশেষ করে তাদের সশস্ত্র বাহিনী আগে যে বেসামরিক জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করত, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল সিগন্যালের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা উন্নত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।"

বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি ধীরগতির হলেও, ২০২১ সালের মার্চে 'চীন-ইরান সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব' চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটি ত্বরান্বিত হয়। ধারণা করা হয়, এই চুক্তির পরই চীন ইরানকে বেইদুর এনক্রিপ্টেড (সুরক্ষিত) সামরিক সিগন্যালে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল।

নেনসিনি বলেন, "এরপর থেকেই ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্দেশনা এবং কিছু নির্দিষ্ট নিরাপদ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বেইদু সিস্টেম যুক্ত করতে শুরু করে।" বাস্তবে এর অর্থ হলো, ইরান ২০২১ সালের দিকেই পর্যায়ক্রমে মার্কিন জিপিএস-এর ব্যবহার থেকে সরে আসতে শুরু করেছিল। "কিছু বিশ্লেষক ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেইদু একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল এবং সেই হামলার চমৎকার নির্ভুলতার বিষয়টি তারা উল্লেখ করেছিলেন।"

তবে ধারণা করা হয় যে, ইরান গত জুন মাসেই (১২ দিনের যুদ্ধের ঠিক পরে) পরিবহন ও লজিস্টিকসের মতো বেসামরিক ব্যবহারসহ বেইদুত-তে তাদের সম্পূর্ণ রূপান্তর সম্পন্ন করেছিল। উল্লেখ্য, ওই যুদ্ধের সময় জিপিএস-এ ব্যাঘাত ঘটার কারণে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি বেসামরিক উড়োজাহাজ এবং জাহাজ চলাচলও প্রভাবিত হয়েছিল।

নেনসিনি বলেন, "বেইদুর দিকে ইরানের এই ঝুঁকে পড়া মূলত দীর্ঘদিনের উদ্বেগেরই প্রতিফলন, যা প্রমাণ করে যে ইরান ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নির্ধারণকারী প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিল। তবে, ওই ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই ছিল মূল টার্নিং পয়েন্ট, যা তেহরানকে গত বছর এই সম্পূর্ণ রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে বাধ্য করে।"

বেইদু কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা বাড়াতে পারে?

বেইদু সিস্টেম ব্যবহার করে আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর দিকনির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ম্যাগনিয়ার ব্যাখ্যা করে বলেন, এতদিন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ধারণা করা হতো যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো মূলত 'ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম'-এর ওপর নির্ভরশীল। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "এই সিস্টেমগুলো জাইরোস্কোপ এবং অ্যাক্সেলেরোমিটারের মতো নিজস্ব সেন্সরের মাধ্যমে গতি ও ত্বরণ পরিমাপ করে অস্ত্রের অবস্থান নির্ণয় করে। ইনার্শিয়াল নেভিগেশনের সুবিধা হলো এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ এতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না।"

"তবে এর একটি বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে: সময় ও দূরত্বের সাথে সাথে ছোট ছোট পরিমাপগত ভুলগুলো জমতে থাকে, যা ধীরে ধীরে এর নির্ভুলতা কমিয়ে দেয়। আর স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিগন্যাল মূলত এই সমস্যাটিই সমাধান করে।" ম্যাগনিয়ার আরও বলেন, "সাধারণত, একটি ক্ষেপণাস্ত্র তার মূল গতিপথ ঠিক রাখতে ইনার্শিয়াল নেভিগেশন ব্যবহার করে, আর স্যাটেলাইট সিগন্যাল তার পথকে আরও সুনির্দিষ্ট করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা বাড়ায়। এই পদ্ধতির ফলে হামলার নির্ভুলতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।" তিনি জানান, ইরানের জন্য কেবল একটি নেভিগেশন সিস্টেমের ওপর নির্ভর না করে একাধিক সিস্টেম ব্যবহার করাই যুক্তিসংগত হবে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, "একাধিক স্যাটেলাইট সিস্টেমের যুগপৎ ব্যবহার একটি অতিরিক্ত সুবিধা দেয়, আর তা হলো জ্যামিং বা সিগন্যাল ব্যাহত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে ইচ্ছাকৃতভাবে নেভিগেশন সিগন্যালে ব্যাঘাত ঘটানো হতে পারে। যদি কোনো অস্ত্র কেবল একটি স্যাটেলাইট সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই সিগন্যাল ব্যাহত হলে তার নির্ভুলতা কমে যেতে পারে। কিন্তু যেসব দিকনির্দেশনা (গাইডেন্স) ব্যবস্থা একাধিক স্যাটেলাইটের সিগন্যাল গ্রহণে সক্ষম, সেগুলো নেভিগেশন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো বাধার বিরুদ্ধে অনেক বেশি প্রতিরোধী হয়। এছাড়া, বেশি স্যাটেলাইটে প্রবেশাধিকার থাকলে সিগন্যালের জ্যামিতি উন্নত হয়, যা অবস্থানগত নির্ভুলতা বৃদ্ধি করে।"

ধারণা করা হয়, চীনের এই নেভিগেশন সিস্টেমে ভুলের মাত্রা (মার্জিন অব এরর) এক মিটারেরও (৩.৩ ফুট) কম, যার মানে এটি অত্যন্ত নির্ভুল। বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যবস্তু যদি তার স্থান পরিবর্তনও করে, তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তুর দিক সংশোধন করতে পারে। নেনসিনি আল জাজিরাকে বলেন, "এটি বেসামরিক জিপিএস সিগন্যালে যা সম্ভব ছিল তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক ভালো, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাদের এনক্রিপ্টেড সামরিক সিগন্যালগুলো শত্রুদের ব্যবহার করতে দেয় না।"

এছাড়া এটি সম্ভবত ইরানকে পশ্চিমা জ্যামিং সিস্টেমগুলো এড়াতে সাহায্য করবে, যা গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ব্যবহার করেছিল। জিপিএস সিগন্যাল ব্যবহার করা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ২৫ সালে সফলভাবে লক্ষ্যচ্যুত করেছিল তারা। জ্যামিং কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভুল স্থানাঙ্ক (কোঅর্ডিনেট) দিয়ে ধেয়ে আসা ড্রোনগুলোকে ধোঁকা দেওয়া। কিন্তু বেইদু সিস্টেম এ ধরনের হস্তক্ষেপ ছেঁকে (ফিল্টার) ফেলতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া মারিন্স চলতি সপ্তাহে সংবাদমাধ্যম 'বিএনই ইন্টেলিনিউজ'-কে বলেন: "২৫ সালে যে বেসামরিক মানের জিপিএস সিগন্যালগুলো অকেজো হয়ে পড়েছিল তার বিপরীতে, বিডিএস-৩ এর সামরিক স্তরের বি৩এ (B3A) সিগন্যালটিকে মূলত কোনোভাবেই জ্যাম করা (অবরুদ্ধ করা) সম্ভব নয়।"

তিনি আরও বলেন, এই সিস্টেমে "জটিল ফ্রিকোয়েন্সি হপিং এবং নেভিগেশন মেসেজ অথেন্টিকেশন (NMA)" ব্যবহার করা হয়, যা যেকোনো ধরনের 'স্পুফিং' (ভুল তথ্য দিয়ে ধোঁকা দেওয়া) প্রতিরোধ করে। বেইদুতে একটি শর্ট মেসেজ কমিউনিকেশন টুলও রয়েছে, যা অপারেটরদের উড়ন্ত অবস্থায় ২ হাজার কিলোমিটার (১,২৪০ মাইল) দূরের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যোগাযোগ করার সুবিধা দেয়। মারিন্স জানান, এর মানে হলো উৎক্ষেপণের পরও এগুলোকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

ইরানের বেইদু ব্যবহার কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?

বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই ইরানের কাছে বেইদু প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার থাকে, তবে তা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি বিশাল ঘটনা (গেম-চেঞ্জার) হতে পারে। ম্যাগনিয়ার বলেন, "স্যাটেলাইট নেভিগেশনের বিবর্তন আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র পাল্টে দিয়েছে। একসময় কেবল গুটি কয়েক উন্নত সামরিক শক্তির দখলে থাকা নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতা (প্রিসিশন স্ট্রাইক) এখন গ্লোবাল নেভিগেশন অবকাঠামোর সহজলভ্যতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দূরপাল্লার অস্ত্রগুলো যত বেশি নির্ভুল এবং বাইরের বাধার প্রতি প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, সমসাময়িক সংঘাতের প্রযুক্তিগত ভিত্তির ক্ষেত্রে বেইদুর মতো সিস্টেমগুলো তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাবে।"

নেনসিনি যুক্তি দেখান যে, বেইদুর এই কার্যকারিতার প্রতিবেদনগুলো যদি নিশ্চিত হয়, তবে তা ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে (বিশেষ করে যাদের এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে) জিপিএস-এর ওপর তাদের নির্ভরতা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। "সময়ের সাথে সাথে এর ফলে আঞ্চলিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে, যা আরও বৈচিত্র্যময় এবং মার্কিন নির্ভরতা মুক্ত হতে পারে।"

বর্তমান যুদ্ধ চীনকেও একটি বড় সুযোগ করে দিতে পারে। নেনসিনি বলেন, "চীন নিশ্চয়ই তাদের নজরদারি স্যাটেলাইটগুলোর মাধ্যমে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে।" এর মাধ্যমে চীন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের মতো একটি বড় পরিসরের যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের দিকনির্দেশনা ক্ষমতার (গাইডেন্স সক্ষমতা) "ফিল্ড-টেস্ট" বা বাস্তব পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি জড়িত।

"সুতরাং এই যুদ্ধ চীনকে এফ-৩৫ এর মতো আমেরিকার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে তাদের সিস্টেমের কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগ দিচ্ছে। একই সাথে তারা বেইদু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা সম্পর্কেও মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে।"

ইরানের কাছে কতগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে?

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের সঠিক পরিমাণ জানা না থাকলেও, এটিকে এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কয়েকশ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ১০ হাজার কিলোমিটার (৬,২০০ মাইল) পেরিয়ে বিভিন্ন মহাদেশেও আঘাত হানতে পারে।

জুয়েল 'তোকসিন' পডকাস্টকে বলেন যে, ইসরায়েলি এবং মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানে শনাক্ত করা যায় এমন সমস্ত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করলেও, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সঠিক সংখ্যা এবং সেগুলো কোথায় ছড়িয়ে আছে, তা কারও জানা নেই। "ইরান ফ্রান্সের তুলনায় তিনগুণ বড় এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ট্রাকের ওপর বসিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। এত বিশাল একটি এলাকায় এই ট্রাকগুলোকে কীভাবে ট্র্যাক করা (খুঁজে বের করা) সম্ভব?"

তিনি আরও যুক্ত করেন, ইরান সম্ভবত ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় বর্তমান যুদ্ধে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও "বিচক্ষণতার" সাথে মোতায়েন করছে, কারণ তারা মনে করছে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ হলো, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার আগেই সস্তা ইরানি 'শাহেদ' ড্রোনগুলো ধ্বংস করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দেওয়ার অস্ত্র) মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইউক্রেনকে (যেখানে রাশিয়া ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করছে) অনুরোধ করেছে, যাতে তারা নিজেদের তৈরি করা এবং বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভাগাভাগি করে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই