লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।   ছবি: আরটিএনএন

এক-এগারোর পটভূমিতে আলোচিত দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ’র বিরুদ্ধে গুম, হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতিসহ গুরুতর অভিযোগের তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে তাদের এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী’র নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন, বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আগামী ৭ এপ্রিল তাদেরকে আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম’র আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, জুলাই গণহত্যার অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং গুমের অভিযোগে শেখ মামুন খালেদকে ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।
এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) গত সোমবার রাতে রাজধানীর বাসা থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন পল্টন থানার মানব পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় আদালতের মাধ্যমে তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে গত বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়। মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলায় আদালত তারও পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। বর্তমানে দুজনকেই ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিবি সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিয়েই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগসহ অন্যান্য বিষয়েও তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হবে।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ডিবি বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিংবা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের অগ্রগতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ভুক্তভোগী, স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসছে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় আরও ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মানি লন্ডারিংসহ মোট ১১টি মামলার তথ্যও আলোচনায় এসেছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সে সময় তাকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। একই সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের আটক ও নজরদারিতে রাখার ঘটনাও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুম, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাংবাদিক আবু রূশদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ মামুন খালেদকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ করার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এতে এক-এগারোর সময়কার কর্মকাণ্ড, গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রাইব্যুনালে হাজিরের পর মামলাগুলোর অগ্রগতি এবং অভিযোগের ভিত্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে।