বাস্তব জীবন, মোবাইল,  অনলাইন গেম, মেসেজিং অ্যাপ, বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, নোমোফোবিয়া, মাথাব্যথা, হজমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ,
আধুনিক জীবনের নতুন ভয়— ‘নোমোফোবিয়া’ বা ‘নো মোবাইল ফোন ফোবিয়া’।   ছবি: সংগৃহীত

ফোনটা হাতের কাছে না থাকলেই মনে হয় যেন পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন? চার্জ শেষ হওয়ার আগে বারবার চার্জার খুঁজছেন? নেটওয়ার্ক না পেলে অস্থির হয়ে উঠছেন? রাতে ঘুমের আগে ফোন বন্ধ করতে গেলে বুক ধড়ফড় করছে? এসব অনুভূতি হলে জেনে রাখুন, আপনি একা নন। এটাই আধুনিক জীবনের নতুন ভয়— ‘নোমোফোবিয়া’ বা ‘নো মোবাইল ফোন ফোবিয়া’।

মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে অস্বস্তি লাগে? চার্জ কমে গেলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে অস্থির হয়ে পড়েন? এমনকি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও ফোন ছাড়া থাকতে পারেন না? এই অভ্যাসগুলো শুধু দৈনন্দিন নির্ভরতার বিষয় নাও হতে পারে এটি হতে পারে আধুনিক এক ধরনের মানসিক সমস্যার লক্ষণ, যার নাম নোমোফোবিয়া।

“নোমোফোবিয়া’ হল- মোবাইল ফোন বা স্মার্টফোন কাছে না থাকা, চার্জ শেষ হওয়া, নেটওয়ার্ক না থাকা বা ফোন ব্যবহার করতে না পারার কারণে চরম উদ্বেগ ও ভীতি। এটি একটি আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যা প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে জন্ম নেয়।”

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, নোমোফোবিয়া হলো এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারা বা ফোন থেকে দূরে থাকার চিন্তাতেই তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। স্মার্টফোন হাতের কাছে না থাকা, চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া বা নেটওয়ার্ক না পাওয়া এসব পরিস্থিতি অনেকের মধ্যে অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকেই এই সমস্যার জন্ম। মোবাইল ফোন আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকেই মনে করেন, ফোন ছাড়া থাকলে যেন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

কীভাবে বোঝা যায় নোমোফোবিয়া আছে?

নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিছু আচরণ বেশ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। যেমন

• ফোন কাছে না থাকলে অস্বস্তি বা উদ্বেগ তৈরি হওয়া,

• বারবার ফোন চেক করা, এমনকি ঘুমের মাঝেও,

• চার্জ কমে গেলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে দুশ্চিন্তা বাড়া,

• খাওয়ার সময়, বাথরুমে বা ঘুমানোর সময়ও ফোন সঙ্গে রাখা,

• ফোন বন্ধ করার কথা ভাবলেই অস্থির হয়ে পড়া,

এসব লক্ষণ নিয়মিত দেখা গেলে সেটি নোমোফোবিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।

কেন বাড়ছে এই সমস্যা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, মেসেজিং অ্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই ফোনের মাধ্যমে বন্ধু, পরিবার ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখেন। ফলে ফোন থেকে দূরে থাকার বিষয়টি তাদের কাছে বিচ্ছিন্নতার মতো মনে হয়।

কী প্রভাব ফেলতে পারে

নোমোফোবিয়া শুধু মানসিক অস্বস্তিই তৈরি করে না, শারীরিক সমস্যারও কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া, উদ্বেগ বৃদ্ধি এসব সমস্যা দেখা দেয়। অনেকেই রাতে ফোন হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন, যা ঘুমের মান নষ্ট করে।

দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে মাথাব্যথা, হজমের সমস্যা কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো শারীরিক সমস্যাও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মুক্তির উপায় কী

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সহজ অভ্যাস বদলালেই নোমোফোবিয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যেমন—

• ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করা।

• অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা।

• প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ফোন ব্যবহার না করা।

• সময় দেখার জন্য ফোনের বদলে হাতঘড়ি ব্যবহার করা।

• বই পড়া, ব্যায়াম বা বাইরে ঘোরাঘুরির মতো অফলাইন অভ্যাস তৈরি করা।

এছাড়া মাঝে মাঝে ডিজিটাল ডিটক্স করা অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টা বা একদিন ফোন ব্যবহার না করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সমস্যা যদি বেশি তীব্র হয়ে ওঠে, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিমু/এসএস/আরটিএনএন