জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যার দায়ে এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে রংপুর মহানগরীর সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ও সাবেক এসআই নয়নকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
বেরোবির সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক আসাদুজ্জামান মন্ডলকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তারা তিনজনই পলাতক রয়েছেন। এছাড়া বেরোবির পলাতক ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর ও অন্য দুই ছাত্রলীগ নেতাকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
বেরোবি’র সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে দেয়া হয়েছে ৫ বছরের কারাদণ্ড। এছাড়া বাকি আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায় ঘোষণার সময় মামলার ৩০ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ছয়জন ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন। সকালে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। আসামিরা হলেন- এএসআই আমির হোসেন, বেরোবি’র সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।
আর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের আসাদুজ্জামান মন্ডলসহ বাকি ২৪ আসামি পলাতক রয়েছে।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- আরপিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন ও এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু।
৩ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।
রায় ঘোষণা ঘিরে ট্রাইব্যুনালের আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সকাল থেকে পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন।
জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এটি ট্রাইব্যুনালের চতুর্থ রায়। এর আগে তিনটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, যার একটিতে পতিত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বহুল আলোচিত আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ২০২৫ সালের ২৪ জুন। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে ৩০ জুন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় প্রসিকিউশন। ওই দিনই অভিযোগটি আমলে নিয়ে ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার শুরু হয় ২৭ আগস্ট। এর পরদিন থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা মুকুল হোসেন।
দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা সাক্ষ্যগ্রহণের সমাপ্তি ঘটে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। এ সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনসহ মোট ২৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে। তাদের মধ্যে অন্যতম সাক্ষী হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে আবু সাঈদের সহযোদ্ধা প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সাক্ষ্য নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০ জানুয়ারি শুরু হয় যুক্তিতর্ক, যা চলে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। ওই দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরে ৫ মার্চ রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা হলো।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকাকালে পুলিশ তাঁর বুকে গুলি চালায়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। যার পথ ধরে পতন ঘটে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!