ফ্লুরোসেন্ট বাতির আলোয় উজ্জ্বল কাঁচঘেরা কাউন্টারের পেছনে রূপালি ট্রে-তে থরে থরে সাজানো সিঙ্গারা (সমুচা নামেও পরিচিত), বিরিয়ানি এবং হ্যাশ ব্রাউন। বনের মতো গাঢ় সবুজ পোলো শার্ট—ক্যাফের নির্ধারিত ইউনিফর্ম—পরা দুজন কর্মী গ্রিল এবং ক্যাশ কাউন্টারের মাঝে ব্যস্ত পায়ে ছোটাছুটি করছেন। দুপুরের খাবারের সময় ভিড় বাড়ছে, আবার কিছুক্ষণ পর কমেও যাচ্ছে।
হোয়াইটচ্যাপেল রোডের ট্র্যাফিক এবং মাঝে মাঝে সাইরেনের শব্দের সঙ্গে কাসাব্লাঙ্কা ক্যাফের ভেতরে ফক্স-লেদার চেয়ারের ঘষটানি আর নিচু গলার কথাবার্তা মিলেমিশে একাকার। কাছাকাছি অফিসগুলো থেকে স্বল্প বিরতিতে আসা কিছু গ্রাহক দ্রুত চিকেন কারি আর ভাত শেষ করছেন; অন্যরা ভাজা ডিম, বিনস আর টোস্ট নিয়ে আয়েশ করে বসছেন। ইস্ট লন্ডন মসজিদে নামাজে যাওয়ার আগে তারা সেরে নিচ্ছেন টুকটাক আলাপচারিতা।
ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি পুরোনো কাঠের টেবিলে বসে আদা-মধু চায়ের লম্বা গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন খালেদ নূর। ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নূর জানালেন, বেশ কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনই এখানকার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলেন, “নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে মানুষ এটা নিয়ে কথা বলা থামায়নি।”
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভোট
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ভোট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, বিরোধীদের বয়কট এবং দমন-পীড়নের অভিযোগের পর এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেই সময় অনেক ভোটার যেমন বিমুখ হয়েছিলেন, তেমনি প্রবাসীরাও দীর্ঘকাল ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ও পরে তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দ্বন্দ্বে আবর্তিত হয়েছে। হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখলেও, একইসঙ্গে স্বৈরতন্ত্র ও দমনের অভিযোগও প্রবল হয়েছে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোণঠাসা বিএনপি এখন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। তারেক রহমান গত ১৭ বছর ধরে লন্ডনে নির্বাসিত। তার সমর্থকরা তাকে একদলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন; অন্যদিকে সমালোচকরা তার অতীতের দণ্ডাদেশ ও দুর্নীতির অভিযোগের দিকে আঙুল তোলেন। গত ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই প্রথম নির্বাচন, যা এই লড়াইয়ে বাড়তি আবেগ ও প্রতীকী গুরুত্ব যোগ করেছে।
এদিকে, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনার পতনের পর দায়িত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করেছে। এই সব পরিবর্তনের মধ্যে, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার পেয়েছেন। নূর বলেন, “বছরের পর বছর ধরে আমরা এই মুহূর্তটির জন্য আন্দোলন করেছি। মানুষ স্বীকৃতি চেয়েছিল।”
তবে ক্যাফের পাশের টেবিলে বসা কয়েকজন কথা বলতে অনাগ্রহ দেখালেন, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মত প্রকাশে তারা সতর্ক। সাবেক স্থানীয় কাউন্সিলর নূর জানান, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কিছু বাংলাদেশি, যারা টেকনিক্যালি ভোট দেওয়ার যোগ্য কিন্তু অভিবাসন মর্যাদা নিয়ে শঙ্কায় আছেন, তারা বেশি সতর্ক। তিনি বলেন, “তারা নির্বাচন খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, কিন্তু নিজেদের দিকে কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে চান না।”
কয়েক দশক ধরে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে বিলিয়ন ডলার পাঠালেও জাতীয় নির্বাচনে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা ছিল না। আন্দোলনকারীরা বলে আসছেন, প্রবাসীদের বাদ দেওয়া অগণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদ। বিশেষ করে অনেক প্রবাসী রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমনের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
ধারাবাহিক চাপের মুখে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া প্রসারিত করে, যার ফলে প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো দূর থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের মতে, প্রবাসী ভোটাধিকার চালু হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখেরও বেশি প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন—যা মোট ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ। ধারণা করা হয়, সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করেন।
তবে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত বাংলাদেশি ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৩২,০০০-এর কিছু বেশি, যা এখানকার বিশাল কমিউনিটির তুলনায় নগণ্য। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেন, যাদের বড় একটি অংশ পূর্ব লন্ডনে বাস করেন। শুধু টাওয়ার হ্যামলেটসেই বাসিন্দাদের প্রায় ৩৫ শতাংশ বাংলাদেশি। এছাড়াও নিউহ্যাম, বার্কিং এবং ড্যাগেনহামেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস।
এই অসামঞ্জস্যতা প্রবাসীদের মধ্যে একটি মূল টানাপড়েন তুলে ধরে: সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার সবসময় মেলে না। পূর্ব লন্ডনের দৈনন্দিন জীবনে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ কেন এত প্রভাব ফেলে তা এই জনমিতি দিয়ে বোঝা গেলেও, এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা দেয় না।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রবাসী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের মতে, কিছু কিছু আসনে প্রবাসী ভোটাররা নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হতে পারেন, যা ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতিতে নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বাস্তবে, শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকা বাংলাদেশি নাগরিকরাই ভোট দিতে পারবেন। অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি, বিশেষ করে যারা যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা মানসিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করলেও নাগরিকত্বের নথিপত্র না থাকায় ভোট দিতে পারছেন না।
ব্রিটেনে বাংলাদেশিরা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বসবাস করলেও বড় আকারের অভিবাসন শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট এবং যুক্তরাজ্যের শ্রমিক ঘাটতি সিলেট থেকে অনেককে লন্ডন ও বার্মিংহামে টেনে আনে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে আরও এক দফা মানুষের আগমন ঘটে। পরবর্তী দশকগুলোতে পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো এলাকাগুলোর জনচিত্র বদলে যায়। এই ইতিহাসের স্তরগুলো ব্যাখ্যা করে কেন বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ এখানকার জনজীবনে এত গভীরভাবে নাড়া দেয়, তবে এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা দেয় না।
কাগজপত্রের জটিলতা ও অনাগ্রহ
দিনের শুরুতে হোয়াইটচ্যাপেল রোড মার্কেটে দুই তরুণীকে দেখা গেল উজ্জ্বল রঙের জেলাবিয়া (পোশাক) দেখছেন এবং সেলাই পরীক্ষা করছেন। নির্বাচনের কথা জিজ্ঞেস করতেই তারা কাঁধ ঝাঁকালেন। একজন বললেন, তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়দের এ নিয়ে কথা বলতে শুনেছেন, কিন্তু বিষয়টি তার কাছে অনেক দূরের মনে হয়।
তিনি প্রশ্ন করেন, “এটা তো আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে না, তাই না? আমরা তো এখানে থাকি।” তিনি যোগ করেন, ব্রিটেনের রাজনীতি—বিশেষ করে লেবার পার্টির সংগ্রাম এবং রিফর্ম পার্টির উত্থান—তার কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
নূর ব্যাখ্যা করেন, তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের মধ্যে এই উদাসীনতা সাধারণ বিষয়। বছরের পর বছর ধরে বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে অনেকেই আশাবাদী হলেও সতর্ক অবস্থানে আছেন। অন্যদিকে ব্যবহারিক বাধাও ব্যাপক অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করেছে। তিনি বলেন, “ভোট দিতে হলে আপনার এনআইডি কার্ড, বায়োমেট্রিক্স এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আরেকটি ডিজিটাল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন। অনেক মানুষের জন্য, বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের জন্য, এটি খুব বেশি জটিল।”
অন্যান্য দেশের পরিসংখ্যান এই বৈপরীত্য তুলে ধরে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যে দেখা যায়, উপসাগরীয় দেশগুলোতে অংশগ্রহণের হার অনেক বেশি। সৌদি আরবে ২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি এবং কাতারে প্রায় ৭৬ হাজার নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন।
টাওয়ার হ্যামলেটসে নিজের অফিসে বসে নূর বলেন, এই পার্থক্য বাস্তব অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসীরা সাধারণত একক পুরুষ, যাদের পরিবার দেশে থাকে এবং স্বাগতিক দেশে তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক অধিকার সীমিত। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা খুব প্রত্যক্ষ ও বাস্তব। এর বিপরীতে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বাংলাদেশি পরিবার, ক্যারিয়ার ও সন্তান নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, ফলে তাদের দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনা এখানকার জীবনকে ঘিরেই আবর্তিত।
মিশ্র অনুভূতি
বয়স্ক অভিবাসী, যারা দেশের ঘটনায় গভীরভাবে মনোযোগী, এবং তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি, যারা ব্রিটেনে শেকড় গেড়েছেন—এই দুই প্রজন্মের বিভাজন পূর্ব লন্ডনের কথোপকথনগুলোতে স্পষ্ট। অনেকেই জানালেন তারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন। এদের অনেকেই কয়েক দশক আগে ব্রিটেনে এসেছেন এবং এখনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট বহন করেন। তাদের কাছে এই নির্বাচন স্মৃতির ভার বহন করে: মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনের বছরগুলো এবং সেই সব নির্বাচন যা একসময় হয় বিপজ্জনক নয়তো অর্থহীন মনে হতো।
মসজিদের কাছের একটি সরু গলিতে দোকানের ওপরতলায় ‘বাংলা সংলাপ’ নামের দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক পত্রিকার ছোট অফিস। এর সম্পাদক মশাহিদ আলী পাঠকদের পাঠানো বার্তা দেখছিলেন, যেখানে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, গুজব খণ্ডন এবং নিবন্ধনের তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “ভোটের অধিকার পেয়ে মানুষ উচ্ছ্বসিত। কিন্তু বিষয়টি পরিষ্কার বা সহজ ছিল না।”
অনেকে অভিযোগ করেছেন যে কর্তৃপক্ষের প্রচারণায় ঘাটতি ছিল। এনআইডি কার্ডের প্রয়োজনীয়তা, হাইকমিশনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, এরপর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল আবেদন—আমলাতান্ত্রিক এই জটিলতা অনেকের উৎসাহে ভাটা ফেলেছে।
কেউ কেউ পোস্টাল ভোটিং সম্পর্কে জানতে পেরেছেন খুব দেরিতে। একজন জানালেন, তিনি সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে এনআইডি কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু কার্ড হাতে পান নিবন্ধন শেষ হওয়ার পর। অন্যরা বলছেন, প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো বয়স্ক ভোটারদের জন্য ভীতিজনক। একজন বয়স্ক ভোটার বলেন, “এখন সব কিছুই অ্যাপে। কিছু ভুল হলে কাকে জিজ্ঞেস করব?”
৪৪ বছর বয়সী কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও হিজামা থেরাপিস্ট মিজানুর খান বলেন, তিনি ভোট দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নিবন্ধনের সময়সীমা মিস করেছেন। এখন তিনি সশরীরে ভোট দিতে বাংলাদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, “সচেতনতার অভাব ছিল। তবে প্রধান বিষয় হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যদি তারা এটা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশের একটা সুযোগ আছে।” লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
যাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল, তাদের সবাই যে ভোট দিয়েছেন এমন নয়। হোয়াইটচ্যাপেল মার্কেটে ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লন্ডনের ছাত্র ২৩ বছর বয়সী রিদওয়ান আহমেদ জানালেন, তার এনআইডি কার্ড আছে কিন্তু তিনি নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কারণে নির্বাচনের বৈধতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি এবং এর প্রতিবাদস্বরূপ তিনি ভোট দেবেন না। পুরো এলাকা জুড়েই এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বললেন, নির্বাচন অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেই দুটি দল এবং তাদের পরিবার দেশ শাসন করছে। তিনি নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না, কিন্তু পরিবর্তনের কথা বলতেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “এখন যদি পরিবর্তন না হয়, তবে কবে হবে?” বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই প্রথম জামায়াতে ইসলামী—দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় দল—ভোট জয়ের ক্ষেত্রে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-এর সঙ্গে জোটবদ্ধ, যা হাসিনা-বিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের নেতাদের দ্বারা গঠিত।
ব্রিটেনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যায় বাংলাদেশের রাজনীতির দুই মেরুর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে। তারেক রহমানের দীর্ঘ লন্ডন প্রবাস পূর্ব লন্ডনের অনেকের কাছেই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ব্রিটেনে তার উপস্থিতি সবসময় আস্থা বা স্বীকৃতিতে রূপান্তরিত হয়নি। অনেকে তাকে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভোটার বলেন, “তিনি তো একজন মানুষ। একই ব্যবস্থার অংশ।” আরেকজন বলেন, ব্রিটেনে দীর্ঘ সময় থাকলেও কর্মজীবী বাংলাদেশিদের সঙ্গে তারেক রহমানের তেমন কোনো অর্থবহ সংযোগ তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, “তিনি অভিজাতদের সঙ্গে মিশেছেন, নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। আমাদের মতো মানুষের সঙ্গে তার কোনো সংযোগ ছিল না।”
ব্রিটেনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম টিউলিপ সিদ্দিক, যিনি লেবার পার্টির এমপি এবং শেখ হাসিনার ভাগ্নি। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা (৮১৮ ডলার) জরিমানা করেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনজীবী ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করলেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর সাবিনা খান ও ওহিদ আহমেদসহ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। জবাবদিহিতা এবং দ্বৈত রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে ব্রিটেন ও বাংলাদেশ উভয় স্থানেই এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব নীতি বিষয়টি আরও জটিল করেছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অনুমোদন থাকলেও, সাংবিধানিক ধারা অনুযায়ী যারা বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বা অন্য দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, তাদের সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ানোর ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে—যে বিষয়টি প্রায়ই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যের আইনে অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে হোম অফিসে নিবন্ধিত হতে হয়; তা না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারী ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই গণ্য হন।
এক নারী প্রশ্ন করেন, “যারা এখানে বসবাস করছেন, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আসলে কতটা জানেন?” আল জাজিরা যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের বেশিরভাগের কাছেই বাংলাদেশের অভিজাত রাজনীতির জটিলতার চেয়ে ব্রিটেনের দৈনন্দিন জীবন, চাকরি, পরিবার ও নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইল অফ ডগস-এ ভিন্ন চিত্র
এই অগ্রাধিকারের বিষয়টি কয়েক মাইল দূরে বোরোর অন্য একটি অংশে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্যানারি ওয়ার্ফের কাঁচঘেরা টাওয়ারগুলো থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে, একটি শান্ত, গাছপালা ঘেরা রাস্তায় স্থানীয় লাইব্রেরির পাশে অনেকটা আড়ালেই অবস্থিত ‘আইল অফ ডগস বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার’। একসময় এটি উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির ঘাঁটি ছিল, কিন্তু এখন এলাকাটি পূর্ব লন্ডনের অভিবাসী ইতিহাসের এক ভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরছে।
ভেতরে চা ও বাটার বিস্কুট নিয়ে জটলা পাকিয়ে বসেছে একটি ছোট দল। আড্ডায় উঠে আসছে নথিপত্র অনুবাদের বিষয়, ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং আসরের নামাজের পরিকল্পনা। এখানেও মানুষের মনে নির্বাচনের চিন্তা। জরুরি পরিষেবা বিভাগে কর্মরত ৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাইফুল মিয়া জানান, এনআইডি কার্ড না থাকায় তিনি ভোট দিতে পারেননি। তবে তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন।
তিনি বলেন, “নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমার পরিবারের শেকড় সেখানে। আমি ব্রিটিশ এবং বাংলাদেশি, তাই অবশ্যই আমি এ নিয়ে ভাবি।” ঘরের অন্য প্রান্তে বসে থাকা ঢাকা নিকটবর্তী কুমিল্লার ৫৮ বছর বয়সী জাহানারা বেগম (ছদ্মনাম) অনুবাদকের সহায়তায় বাংলায় জানালেন, ভোট দিতে পেরে তিনি “খুব খুশি” এবং ইতিমধ্যে তার পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়ে দিয়েছেন। চায়ের কাপ আঁকড়ে ধরে তিনি বলেন, “আমি এটার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছি। অনেক দিন পর মনে হচ্ছে, এবারের ভোটের গুরুত্ব আছে।” তিনি মাত্র তিন বছর আগে ব্রিটেনে এসেছেন।
সাবেক প্রাথমিক শিক্ষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি স্মরণ করেন, ভোট গণনার জন্য রিকশায় ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন, কিন্তু প্রায়ই নিজের ভোট দিতে পারতেন না। তিনি জানান, শেষবার তিনি ভোট দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালে।
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের কথা স্পষ্টভাবে মনে করেন তিনি, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। তার অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে যে ফলাফল দেখা গিয়েছিল, পরে তা বদলে দেওয়া হয়। “আমরা অনেক এলাকায় বিএনপিকে জিততে দেখেছিলাম, কিন্তু ঘোষিত সংখ্যা ছিল ভিন্ন।” এখন ব্রিটেনে থাকলেও ফলাফলের ব্যাপারে তিনি গভীরভাবে আগ্রহী। তিনি বলেন, “আমার চার সন্তান সেখানে আছে। এটা আমার দেশ। আমি শান্তি চাই। আমি তাদের নিরাপত্তা চাই।”
তার বান্ধবী, ৬৯ বছর বয়সী রোমিনা খাতুন, যিনি ১৯৮৫ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং ভোট দিয়েছেন, তিনি মাথা নেড়ে সায় দিলেন। তার কাছেও, বছরের পর বছর সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার পর এই নির্বাচন এক ক্ষীণ আশার আলো। কিন্তু রোমিনার মেয়ে নার্গিস আক্তার (৪৫), যিনি এই সেন্টারের ম্যানেজার হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন, তিনি অতটা আশাবাদী নন। সিলেটে জন্ম হলেও লন্ডনে বেড়ে ওঠা নার্গিস ভোট দেননি এবং তার এনআইডি কার্ডও নেই।
নার্গিস একটি রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে বড় হয়েছেন। খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের (৮০-র দশকের সামরিক শাসক) নামগুলো তিনি শৈশবে খুব গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হতে শুনেছেন। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “আমার বয়স তখন হয়তো সাত বা আট হবে। একটা রাজনৈতিক কার্টুন দেখে বাবা খুব রেগে গিয়েছিলেন। আমি জানতামও না এরশাদ কে, শুধু বুঝতাম এটা আমার বাবা-মায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে তিনি বলেন, “শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলাবে, এমন বিশ্বাস আমার খুব একটা নেই।” নার্গিস বলেন, “সেখানে (বাংলাদেশে) কোনো যথাযথ কল্যাণ ব্যবস্থা নেই, কর্মসংস্থানের অধিকার নেই। মানুষ কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলে, কিন্তু সুরক্ষা ছাড়া সেটার কী মূল্য আছে?”
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!