ইরান, ট্রাম্প, খামেনি, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর তেহরানের দৃশ্য   ছবি: সংগৃহীত

রান যুদ্ধ শুরুর আগে মিত্রদের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের জ্যাকেটে লেখা সেই কুখ্যাত স্লোগানটিরই ভূ-রাজনৈতিক সমতুল্য ছিল: "আমার সত্যিই কিছু যায় আসে না। আপনার আসে কি?" ট্রাম্প প্রশাসন কেবল জোট গঠন করতেই অস্বীকৃতি জানায়নি বা ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের মতো কূটনৈতিক বৈধতা চাইতেও ব্যর্থ হয়নি; বরং তারা ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে এমন এক আক্রমণ শুরু করেছিল, যার খবর অনেক মিত্র দেশ ঘুণাক্ষরেও জানত না।

উদাহরণস্বরূপ ইতালির সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সদস্যের দুবাই সফরের সময়কার অজ্ঞতার কথা ধরা যাক, যার মতাদর্শ ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে ট্রাম্পের অনেক কাছাকাছি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, "ভাবুন তো, এটা কতটা চরম সমন্বয়হীনতা যে, আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেই অঞ্চলটিতে থাকা অবস্থাতেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, অথচ তিনি কিছুই জানতেন না!"

নয় দিন পর, এই যুদ্ধ বিশ্বকে এমন এক বিভ্রান্তিকর ঘূর্ণিপাকে আরও গভীরভাবে টেনে নিয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার' (tear-it-down) রাজনীতির এই অস্থির যুগে ইতোমধ্যেই মার্কিন জীবনযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের প্রথম দিনের হামলায়—যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন—পুরো অঞ্চলজুড়ে এক চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো এমন এক আকস্মিক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়, যা তাদের নয় এবং যা তারা বেশিরভাগই চায়নি। ক্রমপ্রসারমান এই যুদ্ধাঞ্চলে আটকে পড়া নাগরিকদের উদ্ধার করতে কর্মকর্তারা হিমশিম খেতে থাকেন। জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম ভঙ্গুর অর্থনীতিগুলোকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তুমুল শোরগোল ওঠে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্ররা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে, যা মরুভূমির বুক চিরে ওঠা চকচকে কাঁচের শহরগুলোর বিলাসবহুল শান্ত পরিবেশকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং বৈশ্বিক বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়।

এখন, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতি, ইরানের পতন হলে সম্ভাব্য অভিবাসী সংকটের ভয় এবং নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার ঝুঁকিতে কিছু মিত্র দেশ ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছে। এবং সামনে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিজয়োৎসব এবং সমালোচকদের এই যুদ্ধকে ইরাকের চোরাবালির সাথে তুলনা করার প্রবল চেষ্টার পরও, যুদ্ধটি কীভাবে শেষ হতে পারে তা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বোকামি হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরামহীন বিমান হামলা—যা রাজনৈতিক পরিকল্পনার চেয়ে সামরিক কৌশল হিসেবে অনেক বেশি গোছানো বলে মনে হচ্ছে—প্রতিবেশীদের হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের ক্ষমতা নস্যাৎ করে দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এটি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের জন্য লাভজনক হতে পারে, ট্রাম্পকে একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, ইসরায়েলকে অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির সাথে প্রায় ৫০ বছরের শত্রুতার পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উন্নত করতে পারে।

তবে সম্পূর্ণ সরকার পরিবর্তন না হলে, বিপ্লবের পাল্টা জবাবের বদলে যদি কেবল দমন-পীড়ন চলতে থাকে, তবে ইরানিদের এখনও চরম মূল্য চোকাতে হতে পারে। আর ট্রাম্পের এই যুদ্ধ যদি ইরানি রাষ্ট্রকাঠামোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়, তবে একটি বড় আকারের শরণার্থী সংকট বা গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতি সারা বিশ্বকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

'শান্ত থাকুন এবং তাদের (মার্কিনদের) ছোট করবেন না'

এই যুদ্ধ পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক সত্যের জন্ম দিয়েছে—তারা ট্রাম্পের সাথেও বাস করতে পারছে না, আবার তাকে ছাড়াও তাদের চলবে না। ইউরোপীয় এবং উপসাগরীয় মিত্ররা কেন এই যুদ্ধের আঁচ আগে থেকে পায়নি, তা বোঝা কঠিন। এই যুদ্ধটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের নতুন এক 'সবার আগে আমেরিকা' (America First) নীতিরই পেশি-সর্বস্ব বহিঃপ্রকাশ। ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের মতো এটিও গত বছর সিএনএন-এ দেওয়া ট্রাম্পের সহযোগী স্টিফেন মিলারের সেই বক্তব্যেরই প্রতিফলন, যেখানে তিনি বলেছিলেন "বিশ্বের লৌহ কঠিন নিয়ম" হলো—শক্তিশালী দেশগুলো শক্তি প্রয়োগ করেই শাসন করতে পারে। এটি মূলত ট্রাম্পের আগ্নেয়গিরির মতো মেজাজ, বিশাল ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, সুনির্দিষ্ট কৌশলের প্রতি অনীহা এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার প্রতি তার আসক্তিরই প্রতিমূর্তি। আধুনিক যুগের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত এই প্রেসিডেন্ট এখন বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তিকে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা সৃষ্টিকারী শক্তিতে পরিণত করেছেন।

একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক সিএনএনকে বলেন, এই সংঘাতে সামরিকভাবে অবদান রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো "জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা।" অন্যরা যুক্তি দেন যে, ট্রাম্পকে সামলে চলাই এখন একটি বড় জাতীয় স্বার্থ। একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, "আপাতত আমরা শান্ত থাকার চেষ্টা করছি এবং তাদের ছোট করছি না।" তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রকাশ্য বিরোধিতা বুমেরাং হতে পারে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুলিয়েন বার্নস-ড্যাসি বলেন, ইউরোপীয়রা "পুরোপুরি অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছে।" বার্নস-ড্যাসি বলেন, "তারা এখন বৈশ্বিকভাবে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন খামখেয়ালিপনার প্রতিক্রিয়া সামলাচ্ছে, যিনি ব্যাপক মাত্রায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।" তিনি আরও যুক্ত করেন, "তারা এখন শাঁখের করাতে আটকা পড়েছে... একদিকে তারা আন্তর্জাতিক আইন বা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কিছুটা হলেও আঁকড়ে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে তারা মরিয়া হয়ে ট্রাম্পের সুনজরে থাকার চেষ্টা করছে।"

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ট্রাম্পের এই অবজ্ঞা দেখে ইউরোপীয়রা হতবাক হলেও, নিজেদের সামরিক দুর্বলতার কারণেই তাদের এমন একজন প্রেসিডেন্টের সাথে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে, যিনি তাদের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। দ্য হেগ-ভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কগিটোপ্র্যাক্সিস-এর (CogitoPraxis) সিইও নিকোলাস ডাঙ্গান বলেন, "ইউরোপীয়রা আন্তর্জাতিক আইনের একনিষ্ঠ রক্ষক—এমন কথা বলাটা খুব সরলীকরণ হয়ে যায়। বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের অবস্থান হলো, 'আমরা আপনাদের পদ্ধতির নিন্দা জানাব, কিন্তু আপনাদের উদ্দেশ্যকে মেনে নেব।'"

ডাঙ্গান আরও বলেন, "সুতরাং ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের শুরু করা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন ইউরোপীয়রা জড়িয়ে না পড়েও জড়ানোর ভান করছে এবং প্রতিশ্রুতি না দিয়েও প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেষ্টা করছে।" তবে ট্রাম্প, যিনি মার্কিন সামরিক ক্ষমতার ভয়ংকর রূপ দেখে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন, মনে হচ্ছে ইউরোপীয়দের এই তাল মেলানোর চেষ্টার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই করছেন না। শনিবার সিবিএস-এর এক প্রশ্নের জবাবে আরও সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, "আমার তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। তারা যা খুশি করতে পারে।"

জানুয়ারি মাসে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের নতুন দাবির কারণে ইতোমধ্যেই টালমাটাল অবস্থায় থাকা ট্রান্সআটলান্টিক জোটে (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জোট) ইরান যুদ্ধের ধাক্কা আরও বড় আঘাত হেনেছে। যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি থেকে মার্কিন পাইলটদের যুদ্ধবিমান ওড়ানোর অনুমতি দিতে প্রাথমিকভাবে অস্বীকৃতি জানানোর পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালে দুই দেশের মধ্যকার "বিশেষ সম্পর্ক" সংকটের মুখে পড়ে। বিপদগ্রস্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কির স্টারমার "আকাশ থেকে সরকার পরিবর্তনের" নিন্দা জানান এবং ইরাক যুদ্ধের বিভীষিকায় ভোগা ও ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধে মিত্রদের প্রাণহানি নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবজ্ঞায় গভীরভাবে আহত একটি জাতির হয়েই কথা বলেন।

অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্র আরও কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ "আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে" গিয়ে চালানো কোনো হামলাকে "অনুমোদন" দিতে পারেন না। কিন্তু তিনি ফরাসি স্বার্থ রক্ষায় ফ্রান্সের একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে ট্রাম্পের নজর কাড়তে সক্ষম হন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মের্জ ওভাল অফিসে এক জটিল সফর পার করেন, যেখানে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশটির হুমকির নিন্দা জানান। তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলে ইরানের ওপর হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে "লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য নিয়ে রাশিয়ান রুলেট খেলার" দায়ে অভিযুক্ত করেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলায় অবাক হোয়াইট হাউস

ইউরোপ যখন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে ব্যস্ত, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি উত্তপ্ত ও ধ্বংসাত্মক। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং বাহরাইনে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এদের মধ্যে কয়েকটি দেশ ইউরোপীয় ও আমেরিকান প্রবাসীদের জন্য সম্পদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল। কাতারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ এবং তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছাচ্ছে।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরানের এসব পাল্টা হামলায় ট্রাম্প প্রশাসন বেশ অবাক হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এটি হোয়াইট হাউসের যুদ্ধ পরিকল্পনার অগভীরতাকেই প্রমাণ করে এবং সম্ভবত আগামী দিনগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের ধারণা ছিল যে সংঘাত বাঁধলে "অত্র অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।" তবে ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এতটা তীব্র মাত্রায় আঘাত হানবে, তা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি আঁচ করতে পারেনি। ওই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, "দুর্ভাগ্যবশত, এটি তাদের (ইরানের) কৌশলের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির কাতার-ভিত্তিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভও মনে করেন যে, ট্রাম্পের দল ইরানের প্রতিক্রিয়াকে অবমূল্যায়ন করেছিল। ভেনিজুয়েলায় মাদুরোকে উৎখাতের মতো এই অভিযানটিও দ্রুত শেষ না হওয়ায় প্রশাসনের যে "বিস্ময়" দেখা গেছে, তা থেকে তার মনে হয়েছে, "তারা আসলেই ভেবেছিল যে ইরানিরা কেবল ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছে।" তিনি বলেন, "ইরানিরা এখানকার জনজীবন ব্যাহত করেছে। তারা দোহা বা দুবাইকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়নি ঠিকই, তবে যুদ্ধ শুরুর আগে তারা বারবার যে স্পষ্ট হুমকি দিয়েছিল, তারা ঠিক সেটাই করে দেখাচ্ছে।"

উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা কমে এলেও, ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির অস্ত্রভাণ্ডার সামরিকভাবে চূড়ান্ত নির্ণায়ক না হলেও রাজনৈতিকভাবে এখনও বেশ শক্তিশালী। রোববার কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জ্বালানি মজুতগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ড্রোন হামলায় দেশটির সোশ্যাল সিকিউরিটি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সৌদি আরবে একটি আবাসিক স্থাপনায় সামরিক প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র/গোলা) আঘাত হানলে দুজন নিহত এবং ১২ জন আহত হন।

এসব ঘটনাই এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট করে। শনিবার ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি "সংকট নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব এবং এটি শেষ করতে কূটনীতি জোরদার করার" ওপর জোর দেন। আর যে ওমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যস্থতা করছিল (যা ট্রাম্প ভণ্ডুল করে দিয়েছেন), তারাও এখন উদ্বিগ্ন। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি রোববার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অঞ্চলটি একটি "বিপজ্জনক মোড়ে" এসে দাঁড়িয়েছে।

বিষয়টির সাথে পরিচিত তিনটি সূত্রের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর কিছু সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা প্রশাসনের এই বড়াই করা বা দাম্ভিক সুরে বিরক্ত হতে শুরু করেছেন। বর্তমানে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, "ওয়াশিংটন ডিসি থেকে যেসব বার্তা আসছে, তা প্রায় পর্নোগ্রাফিক বা জঘন্য। মনে হচ্ছে যেন নেতারা এই রক্তপাত উপভোগ করছেন, অথচ এর কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তি নেই। এদিকে জিসিসি (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল) ভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"

মিত্রদের কাছে ট্রাম্পের আমেরিকার চাওয়া কী?

ইরানে যদি নতুন মনোনীত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি (তিনি বেঁচে থাকলে) দায়িত্ব নেন, তবে পরিবর্তিত সেই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা হয়তো বাইরের বিশ্বের জন্য কম হুমকি হতে পারে; কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত সামরিক হামলা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর (আইআরজিসি) অবশিষ্টাংশের নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ কোনো সরকার অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, আবার একই সাথে অঞ্চলটির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইরানে সামাজিক কাঠামোর পতনের মতো কোনো বিশৃঙ্খলা কেউ চায় না। আর সবাই জানে যে, ট্রাম্প হয়তো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মতোই এখানেও শুধু বিজয় ঘোষণা করে সব ছেড়ে চলে যেতে পারেন এবং এর পরিণতি মোকাবিলার দায়িত্ব অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসন মনে হচ্ছে ইউরোপীয়দের দুর্বলতা নিয়ে মেতে আছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেই সব মিত্রদের তিরস্কার করেছেন যারা "শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত" হয়ে "হাত কচলায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায়।" নিজেদের নীতি বিসর্জন না দিয়েও এই ফাটল মেরামতের একটি উপায় হতে পারে ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি।

লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের 'সেন্টার ফর স্টেটক্রাফট অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি'-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সোফিয়া গ্যাস্টন বলেন, ব্রিটেনের সাথে জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি জিনিস আশা করে: কৌশলগত মিল, সাংস্কৃতিক মিল এবং ব্যতিক্রমী সক্ষমতা। একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দেখাতে পারলে ওয়াশিংটন হয়তো কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো ক্ষমা করে দিতে পারে।

গ্যাস্টন বলেন, "ব্রিটেনের মতো একটি দেশ তার সার্বভৌম শক্তি, সমৃদ্ধি এবং সক্ষমতায় যত বেশি বিনিয়োগ করবে, অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা তত বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এর ফলে এমন একটি জোটের অস্থিরতার মধ্যেও তারা নিজেদের স্বার্থ আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে পারবে।"

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেবল যুদ্ধের ফলাফলের ওপরই নয়, ইরানের আচরণের ওপরও নির্ভর করবে। মাসগ্রেভ বলেন, "আমার মনে হয় এটা বলাই যায় যে, আপনি যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন সাধারণ বাসিন্দা হন, তবে আপনি অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিরক্ত এবং ইসরায়েলের ওপর আরও বেশি ক্ষুব্ধ। কিন্তু যারা আমাদের দিকে গুলি ছুড়ছে তারা আমেরিকা বা ইসরায়েল নয়। ইরান হয়তো উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে এবং তাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফাটল ধরাতে সুকৌশলে এগোচ্ছে। কিন্তু দিনের শেষে, আমাদের দিকে গুলিটা তো ইরানই ছুড়ছে।"

কিছু পর্যবেক্ষক ধারণা করছেন, ইরানের প্রতি এই ক্ষোভ কিছু উপসাগরীয় দেশকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে সাহায্য করতে পারে—যা ট্রাম্পের একটি প্রধান লক্ষ্য। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন এই যুদ্ধ সৌদি আরবে "শান্তির দ্বার" খুলে দেবে।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা দুজন সাবেক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা ইসরায়েলের সর্বশেষ এই সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে "ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ" শুনতে পাচ্ছেন। একজন কর্মকর্তা ইরাকের নদীগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, "গত আড়াই বছরে ইসরায়েল যুদ্ধ করে সিরিয়া, লেবানন ও গাজার কিছু অংশ দখল করেছে এবং কাতারেও আঘাত হেনেছে। ইসরায়েলি সরকারে এমন কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা আছেন, যারা ইউফ্রেটিস (ফুরাত) এবং টাইগ্রিস (দজলা) নদী পর্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে চান বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তাই কিছু দেশ এখন প্রশ্ন তুলছে, তারা কি কেবল আঞ্চলিক নতুন এক পরাশক্তি হিসেবে ইসরায়েলের উত্থান ঘটানোর জন্যই ইরানের পতন ঘটাচ্ছে?"

ইরান যুদ্ধের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর এবং তা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এই যুদ্ধ বিশ্বকে বদলে দেবে। ট্রাম্পের সবচেয়ে পরিচিত বা সিগনেচার কৌশল হলো—টুকরোগুলো কোথায় গিয়ে পড়বে তা দেখার আগেই প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে ফেলা এবং কোনো না কোনোভাবে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করার উপায় খুঁজে বের করা। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে এই কৌশলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং মিত্রদের পক্ষে এর পরিণতি আগে থেকে আঁচ করা প্রায় অসম্ভব।

প্রেসিডেন্ট গত এপ্রিলে দ্য আটলান্টিককে বলেছিলেন যে, তার প্রথম মেয়াদে তার "দুটি কাজ ছিল: দেশ চালানো এবং টিকে থাকা।" তিনি আরও বলেন: "আর দ্বিতীয় মেয়াদে, আমি দেশ এবং বিশ্ব—দুটিই চালাব।" এই যুদ্ধ বাকি বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে তার সেই অবস্থান কতটা টালমাটাল ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

সূত্র : সিএনএন

আরটিএনএন/এআই