ঢাকা শহরের একটি চিত্র
ঢাকা শহরের একটি চিত্র।   ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা একটি চলমান শহর—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে অন্তহীন যাত্রা। আবার রাতের আধার ভেদ করে নতুন সূর্য দেখা মেলে কিন্তু এই শহর কখনো থামে না। মানুষ ছুটে চলে, গাড়ি ছুটে চলে, নির্মাণ চলে, ভাঙা–গড়া চলে। এই নিরন্তর গতির ভেতরে একটি প্রশ্ন চাইলে করা যায়—এই শহরটি কি আদৌ মানুষের জন্য? নাকি মানুষ কেবল এই যান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি অনুষঙ্গ, একটি সংখ্যামাত্র? প্রতিদিন লাখো মানুষ রাস্তায় নামে জীবিকার তাগিদে, প্রয়োজনের তাড়নায়, বেঁচে থাকার সংগ্রামে। অথচ এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রে যে ‘মানুষ’, তার হাঁটা, দাঁড়ানো, বসা কিংবা নিরাপদে থাকা—এই মৌলিক বিষয়গুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত।
 
উনবিংশ শতাব্দীর জার্মান চিন্তাবিদ ওয়াল্টার বেনিয়ামিন একসময় ‘ফ্লান্যর’-এর কথা বলেছিলেন—যিনি কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই শহরের পথে হাঁটেন, চারপাশ দেখেন, শহরের গল্প বুঝতে চান। শহরকে তিনি পড়েন একটি জীবন্ত পাঠ্য হিসেবে। আমাদের ‘ভবঘুরে’ শব্দটা হয়তো এর সমার্থক শব্দ হবে। একমাত্রিক গতিনির্ভর নগরদর্শনের বিরোধিতা করে নগর চিন্তাবিদ জেন জেকবস বলতেন রাস্তার সাফল্য শুধু যান চলাচলের গতি দিয়ে মাপা যায় না। ভালো রাস্তা হলো সেই জায়গা, যেখানে মানুষ একে অন্যকে দেখে, চেনে, খোঁজ রাখে। যেখানে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা—কথা বলা, বসে থাকা, তাকিয়ে দেখা—শহরকে প্রাণ দেয়। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতার জন্য আমাদের শহরের রাস্তায় খুব কমই জায়গা রাখা হয়েছে। থেমে থাকা, ঘুরে হাঁটা কিংবা হঠাৎ দেখা হওয়ার সুযোগ ঢাকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। আমাদের নগর বাস্তবতায় রাস্তা কেবল দ্রুত পার হয়ে যাওয়ার জায়গা। এখানে থামা মানেই ঝামেলা, দাঁড়িয়ে থাকা মানেই বাধা। শহর পরিকল্পনার ভাষাও সেই বার্তাই দেয়। কত লেনের রাস্তা হবে, কত গাড়ি চলবে, কত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে—এই প্রশ্নগুলোই গুরুত্ব পায়। একজন মানুষ কীভাবে হাঁটবে, কোথায় একটু বসে বিশ্রাম নেবে, একজন বৃদ্ধ বা শিশু কীভাবে নিরাপদে চলাফেরা করবে—এই প্রশ্নগুলো পরিকল্পনার টেবিলে খুব কমই আসে। 
 
ঢাকায় ফুটপাত আছে ঠিকই, বাস্তবে একেকটি বাধার কোর্সে পরিণত হয়েছে। কোথাও তা ভাঙাচোরা, কোথাও উঁচু–নিচু, কোথাও হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে। আবার কোথাও ফুটপাত দখল করে আছে দোকান, হকার, নির্মাণসামগ্রী কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটি। একজন সুস্থ, তরুণ মানুষও মনোযোগ ছাড়া এই ফুটপাত ধরে হাঁটতে পারেন না। সেখানে একজন বয়স্ক মানুষ, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী বা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা ভাবলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শিশুর জন্য তো এটি প্রায় আতঙ্কের পথ—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে পড়ে যাওয়া, গাড়ির সামনে চলে আসা কিংবা ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
 
শহরের রাস্তা কেবল কংক্রিট আর পিচের কাঠামো নয়; এটি সামাজিক জীবনের দর্পণ। একটি সুস্থ শহরে রাস্তা মানুষকে দেখা ও বোঝার সুযোগ দেয়। সেখানে মানুষ শুধু গন্তব্যে পৌঁছায় না, বরং একে অপরের উপস্থিতি টের পায়। কিন্তু ঢাকায় রাস্তা মানেই চাপ, শব্দ আর তাড়াহুড়া। এখানে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার সময় নেই, পরিচিত মুখে হাসি বিনিময়ের সুযোগ নেই। ধীরে ধীরে আমরা এমন এক শহরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, যেখানে মানুষ মানুষকে এড়িয়ে চলে, কারণ থামার জায়গাই নেই।
 
এই বাস্তবতার প্রভাব পড়ে আমাদের মানসিকতায়ও। আমরা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছি, অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। কারণ শহর আমাদের শেখাচ্ছে—থামলে পিছিয়ে পড়বে, ধীরে চললে বিপদ। অথচ মানুষ তো যন্ত্র নয়। মানুষের প্রয়োজন গতি যেমন, তেমনি প্রয়োজন বিশ্রাম, সংযোগ ও অনুভব। যে শহর মানুষকে কেবল ছুটতে শেখায়, কিন্তু থামতে শেখায় না, সে শহর ধীরে ধীরে তার মানবিকতা হারায়।
 
শিশুর চোখে শহর কেমন—এই প্রশ্নের উত্তরেই নগরের প্রকৃত চরিত্র নগ্নভাবে ধরা পড়ে। শিশুর কাছে রাস্তা শেখার জায়গা, দেখার জায়গা, ক্ষেত্রবিশেষে খেলাধুলার পরিসর। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের স্বাধীনভাবে হাঁটার, দৌড়ানোর কিংবা সাইকেল চালানোর সুযোগ প্রায় নেই। ফলে তারা শহরকে জানে গাড়ির জানালা দিয়ে, কিংবা বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর থেকে। শিশুবান্ধব শহরের কথা বললে হয়তো কখনো অতিরিক্ত চা্ওয়া মনে হবে তবে আসলে এর অর্থ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও নিরাপদ বোধ করবে। একজন শিশু বা একজন বৃদ্ধ যদি নির্বিঘ্নে রাস্তা ব্যবহার করতে পারেন, তবে ধরে নেয়া যায় সেই রাস্তা সবার জন্যই নিরাপদ। কিন্তু আমরা ঠিক তার উল্টো পথ বেছে নিয়েছি। আমাদের শহর পরিকল্পনা সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবহারকারী—দ্রুতগতির যানবাহনের সুবিধাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর খেসারত দিচ্ছে সবাই।
 
শহরের বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হকারদের প্রসঙ্গ। ঢাকার হকাররা এই শহরের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা শুধু ফুটপাত দখলকারী নয়; তারা গ্রাম থেকে আসা মানুষের জীবিকার শেষ ভরসা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সাশ্রয়ী কেনাকাটার সুযোগ। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে পথচারী আর হকারের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক স্থায়ী দ্বন্দ্ব। মানবিক সমাধান মানে বরং সবাইকে জায়গা করে দেওয়া। পরিকল্পিত শহরে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকে, নির্দিষ্ট সময় থাকে, বাজারব্যবস্থা থাকে। 
 
ফুটপাত যখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ওঠে, তখন মানুষ বাধ্য হয় মূল সড়কে নামতে। আর ঢাকার মূল সড়ক মানেই গতির সঙ্গে এক অসম প্রতিযোগিতা। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল—সবাই যেন এক অদৃশ্য দৌড়ে লিপ্ত। এখানে পথচারীর কোনো অগ্রাধিকার নেই। ট্রাফিক সিগন্যাল থাকলেও তা যেন মূলত গাড়ির সুবিধার কথা ভেবেই তৈরি। রাস্তা পার হওয়া এখানে নিয়ম মানার ফল নয়, বরং সাহস ও ভাগ্যের পরীক্ষা। অনেক সময় সিগন্যাল মেনেই মানুষ হাঁটেন, তবু নিশ্চিত থাকতে পারেন না যে তিনি নিরাপদে অন্য পাশে পৌঁছাবেন। এই অনিশ্চয়তাই একটি শহরের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয়।
 
শেষ পর্যন্ত আসলে প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায় দৃষ্টিভঙ্গিতে। রাস্তা কেবল শহরের শিরা–উপশিরা নয়, এটি শহরের মন। যে শহর তার নাগরিককে সামান্য ছায়া দিতে পারে না, ক্লান্ত মানুষটিকে বসার জন্য একটি বেঞ্চ দিতে পারে না, নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না—সে শহর ধীরে ধীরে তার প্রাণ হারায়। ঢাকার অনেক রাস্তায় হাঁটলে মনে হয়, এখানে মানুষ যেন অবাঞ্ছিত। ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করতে হলে আমাদের কেবল যানজট কমানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে মানুষ নিয়ে—হাঁটা নিয়ে, থাকা নিয়ে, থামা নিয়ে। রাস্তা হতে হবে যত্নবান। এমন রাস্তা, যেখানে শিশু দৌড়াতে পারবে, বয়স্ক মানুষ বিশ্রাম নিতে পারবেন, আর প্রতিটি পথচারী অনুভব করবেন—এই শহরটি আসলে তাদেরই জন্য। না হলে এই শহর চলতে থাকবে ঠিকই, কিন্তু মানুষকে হারিয়ে ফেলবে।
 
লেখক: স্থপতি, নগর উন্নয়ন পরামর্শক, এলজিইডি।