ঢাকার কূটনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।   ছবি: আরটিএনএন

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে উপহার-ভিত্তিক সৌজন্য বিনিময় দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এতোদিন আম, ইলিশ কিংবা জামদানি শাড়ির মতো উপহার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠিয়ে এক ধরনের ‘সফট ডিপ্লোমেসি’ পরিচালনা করা হয়েছে। এই ধারা কেবল সৌজন্য প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি পারস্পরিক সম্পর্ককে উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ রাখার একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করেছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব উপহার বিনিময় জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক উদ্যোগ এই প্রচলিত ধারার বাইরে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি উপহারনির্ভর কূটনীতির পরিবর্তে চিঠি-ভিত্তিক আনুষ্ঠানিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই পদ্ধতি কূটনৈতিকভাবে আরও গভীর বার্তা বহন করছে। রাষ্ট্রপ্রধানদের উদ্দেশ্যে পাঠানো চিঠিগুলোতে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বয়ান, নিজেদের অবস্থান এবং নীতিগত দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে, যা উপহার কূটনীতির ক্ষেত্রে অনেক সময় হয়ে উঠতো না।

তারেক রহমানের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একদিকে যেমন ঐতিহাসিক ধারার পুনরুজ্জীবন, অন্যদিকে আধুনিক কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কৌশল। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েও চিঠির মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগের উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দিতে চিঠিকে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের চিঠিনির্ভর কূটনীতি এক ধরনের নীতিগত ধারাবাহিকতাও নির্দেশ করে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই কৌশলের তাৎপর্য আরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সময় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে সংহতি জানিয়ে চিঠি পাঠানো বাংলাদেশের অবস্থানকে স্পষ্ট করে। এতে একদিকে মানবিক সহমর্মিতা প্রকাশ পায়, অন্যদিকে কৌশলগত স্বার্থ—বিশেষত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—রক্ষার প্রচেষ্টাও প্রতিফলিত হয়।

এছাড়া ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ঘোষণা এই কূটনৈতিক পদ্ধতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। চিঠির মাধ্যমে সরাসরি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়গুলো তুলে ধরা সম্ভব, যা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে সহায়ক। এটি নির্দিষ্ট কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়।

তবে এই কৌশলের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। উপহার কূটনীতি যেখানে আবেগ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সম্পর্ককে নরম করে, সেখানে চিঠিনির্ভর কূটনীতি তুলনামূলকভাবে আনুষ্ঠানিক এবং কখনও কখনও দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ফলে কার্যকর কূটনীতির জন্য উভয় পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উপহার-নির্ভর সৌজন্য কূটনীতি থেকে চিঠিনির্ভর কৌশলগত কূটনীতিতে এই পরিবর্তন দেশটির বৈদেশিক নীতিকে আরও সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে এই দুই ধারার সমন্বিত প্রয়োগই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হতে পারে।