তেহরান-ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি: আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থানে ইরান, ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, তেহরান, ওয়াশিংটন, যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী, হরমুজ, তেল, জ্বালানি, তেল সংকট, জ্বালানি সংকট, ট্রাম্প, খোমেনি, ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা আলি খামেনি,
আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ইরান।   ছবি: সংগৃহীত

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যেকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। যুদ্ধবিরতি থেকে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি করলে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিও করতে পারেন। তবে বাস্তবে আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে প্রবেশ করছে ইরান।

শীর্ষ নেতৃত্বের প্রাণহানি সত্ত্বেও তেহরানের শাসকগোষ্ঠী যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে ভেঙে পড়েনি। তাদের হাতে এখনও রয়েছে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় মজুদ, যা সংঘাতের মূল কারণ। একই সঙ্গে ইরান প্রমাণ করেছে যে চাইলে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসনে তারা ১০ দফা শর্ত দিয়েছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেনে নিয়েছেন। শর্তগুলো হলো:

১. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরি করার অঙ্গীকার।
২. ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
৩. মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর কোন ধরনের হামলা না করা।
৪. দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি, যা সেফ প্যাসেজ প্রটোকল এবং ইরানের নিয়ম অনুযায়ী হবে।
৫. ইরানের ওপর আরোপিত সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
৬. যুদ্ধের কারণে ইরানকে ক্ষতি পূরণ দিতে একটি বিনিয়োগ ও আর্থিক তহবিল গঠন।
৭. পারমাণবিক উপাদান সমৃদ্ধ করার ইরানের অধিকারকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির মাত্রা নিয়ে আলোচনা।
৮. মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার অনুমতি।
৯. মধ্যপ্রাচ্যের সব প্রতিরোধ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনাগ্রাসন নীতি সম্প্রসারণ।
১০. সব প্রতিশ্রুতি জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন।

আরব উপসাগরীয় সূত্র বলছে, ইরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি জাহাজ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। বাস্তবায়িত হলে এটি আন্তর্জাতিক নৌপথে বড় পরিবর্তন হবে।

এই অনিশ্চয়তার কারণে উপসাগরে আটকে থাকা শত শত জাহাজ বের হতে চাইবে, কিন্তু নতুন জাহাজ প্রবেশে রাজি নাও হতে পারে। পাশাপাশি, ইরানকে টোল দিলে তা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও তৈরি করবে। ইরান এভাবেই শক্তি প্রদর্শন করছে।

পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে ট্রাম্প একের পর এক কঠোর হুমকি দিয়েছিলেন, এমনকি ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের কথাও বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চাপ ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি। বরং আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ট্রাম্পের ১৫ দফা প্রস্তাব আলোচনায় আসেনি।

ইরানের হাতে এখন প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব। যুদ্ধের আগে তেহরান এই মজুদ ছাড়তে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু এখন এটি তাদের সবচেয়ে বড় দরকষাকষির অস্ত্র। এবারের আলোচনায় ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা ভয়াবহ আঘাত সত্ত্বেও টিকে থাকতে পারে। শীর্ষ নেতার মৃত্যু এবং বড় ক্ষতির পরও তাদের সামরিক কার্যক্রম থেমে যায়নি।

ফলে, নতুন বাস্তবতায় ইরান হরমুজ প্রণালীর আংশিক নিয়ন্ত্রক এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানে, ইরানের সঙ্গে ফের বিরোধে জড়ালে জ্বালানি বাজারে আঘাত হানতে তাদের ভয়াবহ চাপের মুখোমুখি হতে হবে।

সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পের জন্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্বস্তি আনলেও, কৌশলগতভাবে আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ইরান।