হাওর জনপদ, সরিষা চাষ, বাকৃবি, কিশোরগঞ্জ, মিঠামইন, বাউরেস,
বাকৃবির গবেষণায় হাওরের ভাগ্য বদলাবে স্বল্পমেয়াদি সরিষা   ছবি: আরটিএনএন

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর জনপদ প্রতিবছরই জলবায়ুজনিত নানা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। কৃষি ব্যবস্থা এখানে অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান হলেও আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা এবং ঠান্ডাজনিত চাপ উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।  

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো রোপণের আগের অব্যবহৃত সময়কে কাজে লাগিয়ে সরিষা আবাদ করলে কৃষকরা অতিরিক্ত একটি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। এতে যেমন পতিত জমির ব্যবহার বাড়বে, তেমনি বোরো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি কমবে। সেই সাথে উন্মোচিত হবে টেকসই ও লাভজনক শস্যক্রমের নতুন দিগন্ত। এ তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এক গবেষণায়। 

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ৫নং কেওয়ার জোর ইউনিয়নের কুড়ারকান্দি এলাকায় গবেষণা প্রকল্পটির মাঠ দিবসে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রধান গবেষক বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম। সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ আনোয়ার।

কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসানের সভাপতিত্বে মাঠ দিবসে উপস্থিত ছিলেন, বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান, বাউরেসের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পরেশ কুমার সাহা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম খান অপু এবং অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলমসহ স্থানীয় কৃষকবৃন্দ।

বাকৃবির গবেষণায় হাওরের ভাগ্য বদলাবে স্বল্পমেয়াদি সরিষা

জানা যায়, ‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন ’ প্রকল্পটি ২০২৩ সাল হতে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাওর অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।  

গবেষকবৃন্দ জানান, এই অঞ্চলে উচ্চফলনশীল বোরো ধান উৎপাদনের প্রধান বাধা হলো আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খরা।

বোরো ধান চাষে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ঠান্ডাজনিত চাপ। যদি ডিসেম্বরের আগে বোরো ধান রোপণ করা হয়, তবে প্রজনন পর্যায়ে (ফুল আসার সময়) ঠান্ডার কারণে শীষে দানা বন্ধ্যা হয়ে যায়। অন্যদিকে, ডিসেম্বরের পরে রোপণ করলে বেশিরভাগ সময় ধান পাকতে পাকতেই আগাম আকস্মিক বন্যা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদন এক ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ও নিরাপদ শস্যক্রম খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে উঠেছে। 

হাওর অঞ্চলে সবচেয়ে প্রচলিত শস্যক্রম হলো পতিত–বোরো–পতিত, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে রবি মৌসুমে বিপুল জমি পতিত পড়ে থাকে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের সময়টুকুতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষের মাধ্যমে একটি অতিরিক্ত ফসল অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এতে কৃষকরা অন্তত একটি ফসল নিশ্চিতভাবে ঘরে তুলতে পারবে। এমনকি বোরো ধান যদি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তও হয়। 

তারা আরও জানান,  কিশোরগঞ্জ জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলা - ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী সম্পূর্ণভাবে হাওরবেষ্টিত এবং আরও পাঁচটি উপজেলা আংশিকভাবে হাওর অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকার মানুষ প্রধানত কৃষিনির্ভর এবং জীবিকার জন্য পুরোপুরি কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল।

 হাওর এলাকার কৃষকরা তাদের বোরো ফসলকে অনেক সময়ই “ভাগ্যের ফসল” হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ প্রায় কয়েক বছর পরপর ধান পাকতে শুরু করার সময় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয় এবং সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার আক্রমণ আরও অনিয়মিত ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এবং এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুতরভাবে পড়ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০১০ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা হাওর অঞ্চলে অপূরণীয় ক্ষতির সৃষ্টি করেছে।

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রকল্পটি বিগত প্রায় তিন বছর যাবত পরিচালিত হচ্ছে।

গবেষণার বিষয়ে তারা বলেন, গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩–২০২৪) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইন্সটিটিউটের(বিনা) উদ্ভাবিত ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত তিনটি বপন সময়ে (১০, ২০ ও ৩০ নভেম্বর) পরীক্ষা করা হয়। 

ফলাফলে দেখা যায়, ২০ নভেম্বর বপনে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়, যার কাছাকাছি ফলন দেয় বারি সরিষা-১৭। সরিষার পরবর্তী ধান (ব্রি ধান১০০) গড়ে ৬.২ টন প্রতি হেক্টরে ফলন দেয়, যা শস্যক্রমকে লাভজনক হিসেবে তুলে ধরে।

দ্বিতীয় বছর (২০২৪–২০২৫) গবেষণায় নির্বাচিত দুটি জাত - বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৭ কে বিভিন্ন সার ও বীজ হার ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়। প্রস্তাবিত  বীজ হার (৮ কেজি প্রতি হেক্টর) ও সার মাত্রা (১০০ শতাংশ ) প্রয়োগে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে বিনা সরিষা-৯ থেকে। সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ধান (সবুজ সাথী) গড়ে ৬.৪ টন প্রতি হেক্টরে ফলন দেয় এবং পুরো শস্যক্রমে ধান সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০.১ টন প্রতি হেক্টর । গবেষণার তৃতীয় বছর (২০২৫–২০২৬) বর্তমানে চলমান। আমরা আশা করি, এটি বাস্তবায়িত হলে হাওর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় দুটোই বাড়বে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

হাওর অঞ্চলে সরিষা চাষের  প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে বলেন, প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো- প্রতি বছর একই সময়ে পানি নেমে না যাওয়ায় সরিষা বপনের সময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, হাওরের সব ধরনের জমিতে সরিষা চাষ সম্ভব নয়, বিশেষ করে উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি বা কান্দা এলাকার জমিই সরিষা চাষের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী, বিশেষ করে অক্টোবরের শেষদিকে বা নভেম্বর এর শুরুতে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি সরিষার বপন ও প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বড় বাধা সৃষ্টি করে। 

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে বলেন জানিয়েন গবেষকবৃন্দ- আগাম বন্যা ও সময় সংকট এড়াতে আরও বেশি স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত পরিপক্ব সরিষার জাত উন্নয়ন করা প্রয়োজন, পার্শ্ববর্তী জমিতে সেচ পানি চলে আসার কারনে সরিষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই হাওরের জমির ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় কৃষকদের একত্রিত করে কমিউনিটি ফার্মিং চালু করলে আবাদ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। এতে সরিষা চাষ বাড়বে এবং সরিষা–বোরো ধান শস্যক্রমকে জনপ্রিয় করতে কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

এবার গবেষণার অংশ হিসেবে দেওয়া বিনা সরিষা-৯ চাষ করেছেন হাসন রাজা। তিনি জানান, হাওরের কিছু উঁচু জায়গা রয়েছে। এইসব জায়গায় পানি আসে না। আগে ভুট্রা চাষ করতাম। কিন্তু ক্ষতি হওয়ায় এখন সরিষা করছি। লাভের আশা করছি। এখন আমাদের দেখাদেখি অনেকেই সরিষা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। হাওরে এখন সরিষা নতুন ফসল হিসেবে প্রচলিত হচ্ছে।

নজরুল ইসলাম নামের আরেকজন কৃষক বলেন, আমি ৩ বছর যাবত সরিষা চাষ করি এবং সরিষার তেল ব্যবহার করছি। আমার নিজেরই গ্যাসের সমস্যা ছিলো, সরিষার তেল ব্যবহার করে এখন সমাধান হয়েছে। নিজে সরিষা ভাঙিয়ে  স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করতে পারছি এটাই বড় লাভ বলে আমি মনে করি।

অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলম বলেন, আমরা হাওরের উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। আমরা ঘোষণা করেছি যে এখানে কোনো কৃষক যদি ধানের পরিবর্তে সরিষা চাষ করতে চাই, তাহলে আমরা বিনামূল্যে বীজ ও সার দিবো। সরিষা স্বাস্থ্যের জন্যে যেমন উপযোগী, অন্যদিকে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। সরিষা মাটির উর্বরতাও  বৃদ্ধি করে। এজন্যে যত্ন সহকারে সরিষা চাষে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, ১৫ বছরে হাওরের অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আগে শুধু ধান চাষ হতো। এখন ভুট্রা, সরিষাও হচ্ছে। জমিকে যতো ব্যবহার করা যাবে ততই বেশি পাওয়া যাবে। শুধু ধান চাষ করে বসে থাকলে হবে না,  বিভিন্ন ধরণের শাক, সবজিও সাথে চাষ করতে হবে। সরিষার চাষ এখন হাওরে  লাভের মুখ দেখছে। এ গবেষণার মাধ্যমে হাওরের সরিষা সারা দেশে বিস্তার লাভ করবে বলে আশা করছি।