নির্বাচন, বিএনপি, জামায়াত, জুলাই বিপ্লব
নির্বাচনে গুরুতর অনিয়ম ও নির্বাচনোত্তর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স।   ছবি: আরটিএনএন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গুরুতর অনিয়ম ও নির্বাচনোত্তর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স (ইডব্লিউএ)। সংগঠনটি বলছে, জুলাই বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত কলঙ্ক ও সহিংসতামুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি: একটি মূল্যায়ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ইডব্লিউএ তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। ইডব্লিউএ’র প্রেসিডেন্ট ও সরকারের সাবেক সচিব প্রফেসর ড. শরিফুল আলম সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর সংগঠনের মূল্যায়ন সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন।  এর আগে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচন দিবস ও পরবর্তী দুই দিনের সহিংসতার সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

ইডব্লিউএ জানায়, ভোটের দিনের প্রথমার্ধ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল এবং ভোটার উপস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল। তবে দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী; পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা বা জোরপূর্বক বের করে দেওয়া, ভোট গণনায় দীর্ঘসূত্রিতা,ফলাফল ঘোষণায় অস্বাভাবিক বিলম্ব, রেজাল্ট শিটে ঘষামাজার অভিযোগ,

ভোটার সংখ্যা ও ঘোষিত ফলাফলের অসঙ্গতিসহ নানা অভিযোগ তুলে ধরে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ত্রুটির ইঙ্গিত বহন করে বলে মন্তব্য করেন ড. শরিফুল আলম। তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণ নয়; প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সঠিক ভোট গণনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এতে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের পদায়ন হয়েছে।

নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক বদলি, নির্বাচন কমিশনের গঠন ও দায়িত্ব বণ্টনসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত একটি বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ইডব্লিউএ’র পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্বাচনে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কার্যকর থাকলেও পুলিশের ভূমিকা ছিল তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় ও দায়সারা ধরনের। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতার অভাব থাকলে নির্বাচন আংশিক শান্তিপূর্ণ হলেও সামগ্রিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয় বলেও মন্তব্য করা হয়।

এছাড়াও সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ভোটের দিন ও পরবর্তী দুই দিনে সারাদেশে অন্তত দুই শতাধিক সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় হত্যাকাণ্ড, হামলা, নারী নির্যাতন, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। ইডব্লিউএ দাবি করে, বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়ে অভিযোগ করে সংগঠনটি বলে, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার নির্বাচনোত্তর সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিজয়ী দলও নিজেদের কর্মীদের সহিংসতা থেকে বিরত রাখতে পারেনি বলে মন্তব্য করা হয়।

স্বাধীন তদন্ত ও শাস্তির দাবি করে ড. শরিফুল আলম বলেন, নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়; নির্বাচন-পরবর্তী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি সব অনিয়ম ও সহিংস ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইডব্লিউএ’র সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার জাকারিয়া আহমদ,  মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান-সহ সিভিল সোসাইটির ব্যক্তিবর্গ।