সুজন, গণভোট
‘সুজন-এর দৃষ্টিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন।   ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনটি মনে করে, এবারের নির্বাচনে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারা ছিল সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেন মাঠ পর্যায়ের ৯২টি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট উপস্থাপন করেন।

একরাম হোসেন বলেন, আরপিওর বিধান অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দলই তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্যানেল তৈরি করেনি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর না মেলার বিষয়টি ছিল সবচেয়ে আলোচিত।

তিনি জানান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে মনোনয়ন না পেয়ে যারা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেন, তাদের ওপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য দলীয় চাপ ছিল। তবে চাপ সত্ত্বেও ৭৮ জন প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি এবং পরবর্তীতে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচারণা চালানো, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া এবং পেশিশক্তির ব্যবহার ছিল দৃশ্যমান।

নির্বাচনের আগে ফরিদপুর, পঞ্চগড়, মাদারীপুর ও গাজীপুরে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এছাড়া খাগড়াছড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ এবং ফরিদপুরে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

নির্বাচনী সহিংসতায় ঝিনাইগাতী ও শ্রীবর্দীতে নিহতের ঘটনা ঘটে। ভোটের দিন খুলনা-২ আসনে একজন ভোটার মারা যান এবং মেহেরপুর-২ আসনে অন্তত ১৫ জন আহত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটের দিন চুয়াডাঙ্গা-১, চুয়াডাঙ্গা-২, কুষ্টিয়া-৩ ও পঞ্চগড়-১সহ কয়েকটি আসনে অনেক প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট অনুপস্থিত ছিলেন।

একরাম হোসেন অভিযোগ করেন, চুয়াডাঙ্গা ও পঞ্চগড়ে ধর্মীয় শপথের মাধ্যমে ভোট দিতে বাধ্য করা এবং গোপন বুথে প্রবেশের ঘটনা ভোটারের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া ভোলা-১ ও ঝালকাঠি-১ আসনে ফলাফল পরিবর্তন ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সুজনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় দুই ডজন অভিযুক্ত ঋণখেলাপি এবং কয়েকজন দ্বৈত নাগরিক এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করেন—যাদের মধ্যে ৪১ জন বিএনপির এবং ৪ জন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। এদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন।

সংগঠনটি অভিযোগ করে, তদন্ত সম্পন্ন না করেই নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করেছে।

সুজন জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। ১৯৭৯ সালের পর এ নির্বাচনেই সর্বাধিকসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০.২৬ শতাংশ। গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২০টি (৬২.০৩%) এবং ‘না’ ভোট পড়ে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি (২৮.৪১%)। বাতিল ভোটের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ।

একরাম হোসেন বলেন, নির্বাচনে জয়ী দলের নেতা কর্তৃক পরাজিত প্রার্থীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং পরাজিত পক্ষের অভিনন্দন জানানোর ঘটনা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নতুন শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সুজন আশা প্রকাশ করে, নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করবে।