জঙ্গল সলিমপুর, রহস্য, সন্ত্রাসী
জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।   ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অবস্থিত সলিমপুর এলাকা এক সময় নব্বই দশকের শুরু থেকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সরকারি তিন হাজার একর খাসজমি কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি, যা বছরের পর বছর ধরে প্লট ও দখল বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এলাকায় সক্রিয় রয়েছে দুই মূল সন্ত্রাসী গ্রুপ—ইয়াসিন ও মশিউর রহমানের নেতৃত্বে। গত দেড় বছরে এই দুটি গ্রুপের দ্বন্দ্বে অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ঢুকলেই হামলার শিকার হচ্ছে।

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে র‌্যাব সদস্য নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। র‌্যাব-৭-এর ৪৩ জন সদস্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চালাতে গেলে হামলায় তিন র‌্যাব সদস্য আহত হন এবং মোতালেব হোসেনকে চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হয়। পরে ২০ জানুয়ারি দুপুরে পতেংগা র‌্যাব-৭ সদর দপ্তরে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) একেএম শহিদুর রহমান জানান, সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য থেকে জঙ্গল সলিমপুরকে মুক্ত করা হবে। নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। মামলার রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাব সার্বক্ষণিক মনিটর করবে।

র‌্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, হামলায় ৪০০–৫০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী অংশ নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, র‌্যাবের দুটি মাইক্রোবাসে আক্রমণ চালানো হয় এবং গাড়ির কাচ ভাঙা হয়। আহত সদস্যদের শরীরে ব্যান্ডেজ ও রক্তের দাগ লক্ষ্য করা গেছে।

বিগত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে সলিমপুরে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। ইয়াসিন ও মশিউরের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা এলাকায় সার্বক্ষণিক পাহারা দিয়ে বসতি ও প্লট–বাণিজ্য চালাচ্ছে। এলাকার বাসিন্দাদের প্রবেশের জন্য পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, পুলিশের মতো সরকারি কর্মকর্তারাও ঢুকতে পারছে না।

গত কয়েক বছরে প্রশাসনের অভিযানের সময়ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ অভিযান শেষে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালে উচ্ছেদ অভিযান শেষে জেলা প্রশাসকের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

সরকার সরকারি খাসজমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এলাকার জন্য কারাগার, আইটি পার্কসহ ১১টি প্রকল্প পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী ও অবৈধ দখলের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিন গ্রুপ এলাকায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে র‌্যাবের ওপর হামলা চালায়। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে কাজী মশিউর, গাজী সাদেকসহ গ্রুপটির সদস্যরা প্লট মালিকদের নিয়ন্ত্রণে আছে।

সলিমপুরের এই রহস্যঘেরা জনপদ কেবল অবৈধ বসতি বা সন্ত্রাসী গ্রুপের কেন্দ্র নয়, এটি চট্টগ্রামের এক অদৃশ্য নগর-সীমান্ত, যা প্রশাসন, র‌্যাব ও সাধারণ মানুষ সবাইকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।