জ্বালানি সংকট, পাম্প বন্ধ
খোলা পাম্পগুলোর সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। এ সময় বহু চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায়।   ছবি: আরটিএনএন

রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকটের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাতে সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পে ‘অকটেন নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। খোলা পাম্পগুলোর সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন এবং বহু চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরছেন। এই পরিস্থিতি নাগরিক জীবনের পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং, লজিস্টিকস এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। পাম্পগুলোকে বাধ্য হয়ে রেশনিং পদ্ধতিতে বিক্রি করতে হচ্ছে। এক পাম্পে তেলের স্বল্প পরিমাণ পাওয়ার কারণে ক্রেতারা এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটছেন। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে পাম্পের কর্মীদের সঙ্গেও অনেক ক্রেতা মেজাজ হারিয়ে দুর্ব্যবহার করছেন।

এ বিষয়ে শান্ত সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. বোরহান উদ্দিন জানান, তিনটি ট্যাংকার প্রয়োজন হলেও তারা বর্তমানে একটিই পাচ্ছেন। এই চাহিদা–সরবরাহের ব্যবধানে ফারাক বাড়ছে। এতে নাগরিকরা শুধু সময় হারাচ্ছেন না, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

মিরপুর, উত্তরা, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে। অনেক চালক যানবাহনের ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ছেন। রাইড শেয়ারিং চালকরা জানাচ্ছেন, দীর্ঘ লাইনের কারণে দৈনিক আয় কমে যাচ্ছে। এছাড়া, ক্রেতাদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও চাপা ক্ষোভে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে অনেক জায়গাতেই।

একইভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরটিএনএনের প্রতিনিধিরাও পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়েছেন। তাদের দেয়া তথ্যমতে, ঢাকার বাহিরেও বিভিন্ন জেলাতে পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো।

বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাম্পগুলোতে তেল মজুত রাখার সক্ষমতা নেই এবং বিভিন্ন সংস্থার নজরদারি থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

এ দিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। সংকটের মূল কারণ সাময়িক চাহিদা বৃদ্ধিই। তিনি বলেন, “ডিমান্ড বেড়ে গেছে, কিন্তু সাপ্লাই আগের মতো চলছে। তাই সাময়িকভাবে সংকট দেখা দিয়েছে।” 

মন্ত্রী আরও সতর্ক করেছেন, অকারণে তেল মজুত করার প্রয়োজন নেই এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ এনার্জি কমিশনের দায়িত্ব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের এই সময়ে ঈদের ছুটির কারণে ব্যাংক ও ডিপো বন্ধ থাকায় পেমেন্ট ও সরবরাহ জটিলতার সঙ্গে নাগরিকদের চাহিদা বৃদ্ধি মিলিত হয়ে সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে নগরাঞ্চলে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, নগর পরিবহণের চাহিদা এবং সীমিত সরবরাহ ব্যবস্থা একত্রিত হয়ে একটি জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র ট্যাংকার সংখ্যা বা পাম্পে সরবরাহ বৃদ্ধি করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শহরের ব্যস্ততম এলাকায় তেলের জোগান ও চাহিদার সামঞ্জস্য করতে যথাযথ পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ক্রেতা সচেতনতার প্রয়োজন। এছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সংকট আরো জটিল আকার ধারণ করবে। যা  ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।