নির্বাচন ২০২৬, নির্বাচন, সংসদ
নির্বাচনের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়।   ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার সাধারণ ও বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছে ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ছুটি শুরুর প্রথম দিনেই রাজধানী ঢাকা থেকে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘ ভোগান্তিতে—যেখানে বাস সংকট, কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া আর তীব্র যানজট মিলেমিশে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।

ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশপাশের সড়কগুলোতে যে চিত্র দেখা গেছে, তা নতুন নয়। নির্বাচন, ঈদ বা বড় কোনো ছুটি এলেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পরিকল্পনার অভাব আর পরিবহন খাতের অনিয়ন্ত্রিত আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে যাত্রীদের ঘাড়ে।

প্রশ্ন উঠছে—বাস সত্যিই কম, নাকি সংকট তৈরি করা হয়েছে? যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, আন্তঃজেলা ও অন্তঃজেলা অনেক বাস স্বাভাবিক রুট ছেড়ে একাধিক ট্রিপ মারছে বেশি আয়ের আশায়। ফলে নির্দিষ্ট রুটে বাসের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এটি সরাসরি যাত্রীসেবার পরিপন্থী হলেও কার্যত কোনো নজরদারি না থাকায় পরিবহন শ্রমিক ও মালিকেরা সুযোগ নিচ্ছেন।

পরিবহন খাতের এই ‘চাহিদা–সরবরাহ’–এর কৃত্রিম ভারসাম্যহীনতা যাত্রীদের বাধ্য করছে বিকল্প ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে উঠতে—যেমন ট্রাক। এটি শুধু ভোগান্তির নয়, নিরাপত্তার প্রশ্নও তোলে।

ভাড়া নৈরাজ্য চরমে

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের মতো নিয়মিত রুটে যেখানে ২০০–২৫০ টাকা ভাড়া নির্ধারিত, সেখানে ৫০০–৬০০ টাকা আদায় কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। ট্রাকে জনপ্রতি ৩০০–৪০০ টাকা নেওয়ার ঘটনাও প্রমাণ করে, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সরকারি নির্দেশনা কার্যত অকার্যকর।

প্রতিবারই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু নির্বাচন বা ঈদের মতো পূর্বানুমেয় যাত্রাচাপের সময় আগাম প্রস্তুতি ও মাঠপর্যায়ের তদারকি কেন থাকে না—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

অব্যবস্থাপনার নগ্ন চিত্র

আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট দেখিয়ে দেয়, নির্বাচনকালীন ছুটির ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি কতটা প্রকট। শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ছুটি দেওয়া হলেও তাঁদের যাতায়াতের জন্য বাড়তি পরিবহন, বিশেষ বাস সার্ভিস বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।

ফলে ছুটি, যা হওয়ার কথা স্বস্তির—তা পরিণত হয়েছে মানসিক ও শারীরিক চাপের উৎসে।

বড় প্রশ্ন: দায় কার?

এই ভোগান্তির দায় শুধু পরিবহন শ্রমিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। সরকার ছুটি ঘোষণা করলেও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতি, ভাড়া মনিটরিং ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা পরিস্থিতিকে ‘ব্যবসার সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন—যা সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাবই প্রকাশ করে।

নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভোট দিতে বাড়ি ফেরা মানুষকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে—সময়, অর্থ আর ভোগান্তির মাধ্যমে।

এই সংকট নতুন নয়, সমাধানও অজানা নয়। তবু প্রতিবার একই গল্প ফিরে আসে। প্রশ্ন হলো—এই চক্র ভাঙবে কবে?