রাষ্ট্রপতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর দিনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।   ছবি: আরটিএনএন

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক বিশেষ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো—প্রতিটি সময়েই তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য কি সময় ও ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে যায়?

মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় তাঁকে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবেই অনেকের কাছে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই সরকারের পতন ঘটে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল থাকেন।

এই সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টাদের শপথ পড়ান। এমনকি যেসব ছাত্রনেতা আন্দোলনের সময় থেকেই তাঁর অপসারণ দাবি করেছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে যারা পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হন, তাঁদেরও শপথ পড়াতে হয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকেই। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, রাজনৈতিক অবস্থান বদলালেও সাংবিধানিক কাঠামো কখনো কখনো ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, যে রাষ্ট্রপতিকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত হিসেবেই দেখা হয়েছিল, তাঁর ভাষণে এবার ভিন্ন রাজনৈতিক সুর শোনা গেছে। তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

শুধু তা–ই নয়, তিনি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদী বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং দীর্ঘ শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক দমন–পীড়নের কথাও ভাষণে তুলে ধরেছেন।

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য সংসদ কক্ষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়। তবে বিরোধী দল হিসেবে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যরা ভাষণের সময় প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

এখানেই সামনে আসে একটি বড় বৈপরীত্য। দুই বছর আগে একই রাষ্ট্রপতি ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি সেই সময়ের নির্বাচনের প্রশংসা করেছিলেন এবং নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে তখন বলা হয়েছিল, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন সফল হয়েছে। তখন তিনি বক্তৃতা শেষ করেছিলেন “জয় বাংলা” বলে। অথচ এবার তিনি ভাষণ শেষ করেন “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” বলে।

এই পরিবর্তন কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বক্তব্য কি রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত অবস্থান, নাকি এটি কেবল সরকারের প্রস্তুত করা বক্তব্য?

সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সংসদের শুরুতে রাষ্ট্রপতির যে ভাষণ দেওয়া হয়, সেটি সাধারণত সরকার বা মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করে। রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পাঠ করেন। পরে সেই ভাষণের ওপর সংসদে আলোচনা হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়বস্তু অনেক সময় সরকারের নীতির প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হয়।

তবে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে—এমন দাবি এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে অনেকেই শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখতে রাজি নন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়েও শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। বিচারক হিসেবে অবসর নেওয়ার পর তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। পরবর্তীতে আর্থিক খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা নিয়েও সমালোচনা ওঠে। ফলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ ইতিমধ্যে তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলেছে। ফলে তিনি কত দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকবেন, সেটিও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আরও বিস্তৃত। রাষ্ট্রপতির ভাষণ কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক রীতি হয়ে থাকবে, নাকি সেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারীর নিজস্ব মূল্যায়নও প্রতিফলিত হওয়া উচিত? সময়ের সঙ্গে যদি রাষ্ট্রপতির বক্তব্য বদলাতেই থাকে, তবে তা কি জাতীয় সংসদের মর্যাদা বাড়ায়, নাকি তাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে—এই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।