ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হয়ে আসছেন আরিফ মোহাম্মদ খান। এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এমনকি বিশ্বেও এমন দৃষ্টান্ত একেবারেই নগণ্য।আরিফ মোহাম্মদ খান ৪০ বছর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা তার।
কেন তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে?
আরিফ মোহাম্মদ খান ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক খেলোয়াড়। রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ছাত্র থাকার সময়ে। কংগ্রেসসহ একাধিক সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। সবশেষ যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। বিহারের সদ্য সাবেক গভর্নর।
ভারত কাঁপিয়ে দেওয়া একটি মামলা ছিলো-শাহ বানুর তালাক। ওই সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ছিলেন আরিফ মোহাম্মদ খান। তখন লোকসভায় দাঁড়িয়ে শাহ বানুর রায়ের পক্ষে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি, যার ফলে অনেকেই মনে করেছিলেন, ভারতে পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের পক্ষ নেবে সরকার।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের অবস্থান হয় উল্টো। আর সেই সময়ের প্রভাবশালী তরুণ প্রতিমন্ত্রী আরিফ মোহাম্মদ খান রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভা, এমনকি কংগ্রেস থেকেও পদত্যাগ করেন। বাবরি মসজিদ ভাঙার যে রাজনীতি, তা সবার আগে উপলব্ধি করেছিলেন আরিফ মোহাম্মদ খান। মুসলিম রক্ষণশীলদের উত্থানের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
ভারতে তরুণ বয়সে যে কয়জন ব্যক্তি মন্ত্রী হয়েছিলেন, আরিফ মোহাম্মদ খান ছিলেন তাদের অন্যতম। অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ব্যক্তি রাজীব গান্ধীর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু শাহ বানুর মামলায় রাজীব গান্ধীর অবস্থান নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে মন্ত্রিসভা ও কংগ্রেস ত্যাগ করেন।
কংগ্রেস ত্যাগ করে অন্যদলে যোগ দেন আরিফ খান। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি ঘটে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের। এই ভরাডুবির পেছনে আরিফ মোহাম্মদ খানের কংগ্রেস ত্যাগকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়।
কারণ, শাহ বানুর মামলার রায় ঘোষণার কয়েকমাসের মধ্যেই ঘোলাটে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজীব গান্ধীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে কয়েকটি উপনির্বাচন হয়। সেখানে ভরাডুবি ঘটে কংগ্রেস প্রার্থীদের। ভয় পেয়ে যান রাজীব গান্ধী। মুসলিম ভোট ব্যাংক হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পেয়ে বসে তাকে।
এক সময় রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন আরিফ মোহাম্মদ খান। বলা হয়ে থাকে, আরিফের কথামতোই চলতো রাজীবের সরকার।
কিন্তু মুসলিম তোষণ করতে গিয়ে আরিফ খানকে এড়িয়ে চলা শুরু করেন তরুণ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। আরিফ খানকে কিছু না জানিয়েই রক্ষণশীল আলেমদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু করে সরকারের শীর্ষ মহল। রাজীব গান্ধী সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মুসলিম ভোট ধরে রাখতে হলে ওলামাদের সঙ্গে আপস করতেই হবে। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আসন নিয়ে ভারতে ক্ষমতায় এসেছিলেন রাজীব গান্ধী। তরুণ প্রধানমন্ত্রীকে সবাই আধুনিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে দেখতেন। আশা করা হয়েছিল, তার হাত ধরে ভারতে বড় ধরনের সামাজিক সংস্কার আসবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ওপর জল ঢেলে দিয়ে রাজীব গান্ধী শেষ পর্যন্ত ওলামাদের পক্ষেই দাঁড়ালেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সুপ্রিম কোর্টের শাহ বানু রায়কে কার্যত অকার্যকর করে দিতে নতুন আইন পাস করা হবে সংসদে।
১৯৮৬ সালে সংসদে ‘মুসলিম মহিলা (বিবাহবিচ্ছেদে অধিকার সুরক্ষা) বিল’ আনার ঘোষণা দেয় সরকার। এর বিরোধিতা করেন আরিফ মোহাম্মদ খান। ক্ষোভ ও হতাশায় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে পরে বিলটি পাসও করে নেয় কংগ্রেস। ইতিহাসে এই ঘটনাই পরিচিত হয়ে যায় “শাহ বানু রায়কে উল্টে দেওয়া” হিসেবে। কার্যত, সুপ্রিম কোর্টের মানবিক ও প্রগতিশীল রায় অকার্যকর হয়ে যায় সংসদের এক ভোটে।
এরপরই আরিফ খান মন্ত্রিসভা ও কংগ্রেস ত্যাগ করেন। কিন্তু তার পথচলা থেমে যায়নি। একাধিকবার মন্ত্রী হয়েছেন। শেষে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ বিহারের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই আরিফ খানকেই এবার ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে হাইকমিশনার করে। ভারত সরকার এর আগে এত বড় প্রোফাইলের কাউকে কখনো রাষ্ট্রদূত করেছে কি না, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলছে। আর বাংলাদেশেই কেন এত বড় ঝানু রাজনীতিককে পাঠানো হচ্ছে?
আরিফ খান বাংলাদেশে হাইকমিশনার হয়ে এলে তার পদমর্যাদা কী হবে? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাকে হয়ত পাঠানো হবে ভারতের কেন্দ্রীয় পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে। এর কম দেওয়াটা তার ক্ষেত্রে মানায় না।
আরিফ মোহাম্মদ খানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদকে কেন বাংলাদেশে হাইকমিশনার করে পাঠানো হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে বাংলাদেশ ও ভারতে।
লেখক: সাংবাদিক।
লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!